জ্বালানিসংকট নিরসনে করণীয়
বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে খোদ বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী যখন বলেন, আমাদের হাতে দিন গোনা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। আর অর্থমন্ত্রী যখন বলেন, ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে জ্বালানি ব্যবস্থার উন্নতির কোনো পথ নেই, তখন টেকসই জ্বালানির সমস্যা থেকে আগে বাঁচার উপায় নিয়ে ভাবনা খুব জরুরি হয়ে পড়ে।
গভীর সমুদ্রে পড়ে গেলেও মানুষ খড়কুটো ধরে বাঁচার চেষ্টা করে, যত বড় ঢেউ আসুক না কেন, নিজের সব শক্তি দিয়ে ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে। আর যখন বড় ঢেউ আসে মাথাটা নিচু করে দেওয়া, ঢেউটা চলে গেলে আবার নিঃশ্বাস নেওয়া, যতক্ষণ বেঁচে থাকা যায়। হয়তো এভাবে কয়েক ঘণ্টা বেঁচে থাকলে, কোনো এক উপায়ে উদ্ধারকারীরা উদ্ধার করলেও করতে পারে। এই দুর্যোগ মুহূর্তে যখন প্রতিদিনই কোনো না কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে, মানুষ তার কাজ হারাচ্ছে, শিল্পমালিকেরা ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন। ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। এখন আমাদের জ্বালানির এই অবস্থা। প্রচণ্ড জ্বর বা মাথাব্যথা হলে, টোটকা চিকিৎসা দিয়ে সারানো সম্ভব, সেভাবে এ সময়ে জ্বালানিসংকটে সেই টোটকা চিকিৎসার কথা ভাবা যেতে পারে।
বর্তমানে জ্বালানি ও বিদ্যুতের যে সমস্যা, এর থেকে উত্তরণে কম করে হলেও দুই বছর লাগবে। দুই বছর এ রকম হাত গুটিয়ে বসে থাকলে শিল্প-কলকারখানা সব বন্ধ হয়ে যাবে, প্রবৃদ্ধি হবে নিম্নমুখী। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো কোনো ঋণ দেবে না। তাই এখনই জ্বালানি সমস্যা সমাধানের জন্য উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সে জন্য করণীয় জরুরি ভিত্তিতে সোলার প্যানেল বসাতে হবে। অন্তত দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার প্যানেল বসাতে ছয় মাসের বেশি লাগার কথা না। এ জন্য প্রতিটি সরকারি ভবনের ছাদে প্রথমে বাধ্যতামূলকভাবে আগামী তিন মাসের মধ্যে সোলার প্যানেল বসাতে হবে। ঢাকা ওয়াসার কয়েক শ একর জমি রয়েছে ঢাকার চারপাশে। সেখানে এখনই সোলার প্যানেল বসিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ থেকে তাদের চাহিদা পূরণ করতে হবে। বাকিটুকু জাতীয় গ্রিডে দিয়ে দিতে হবে। যেসব ব্যাটারিচালিত রিকশা বিদ্যুৎ দিয়ে চলে, সেসব মালিককে বাধ্যতামূলকভাবে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেবে, বিদ্যুৎ বিভাগ তাদের কারিগরি সহায়তা দেবে। আর ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তায় চলা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যে পরিমাণ রিকশা রাস্তায় চলে, সে পরিমাণ রিকশার আসলেই প্রয়োজন নেই। এসব রিকশা শুধু বিদ্যুতের ঘাটতিই করছে না, বরং এ যানবাহনগুলো ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর সম্পূর্ণ রাস্তা ও ফাঁকা জায়গা দখল করে নিয়েছে। ফলে সারা দেশ রিকশার বস্তিতে পরিণত করেছে। জনগণ এদের অত্যাচার থেকে মুক্তি চায়।
সাবেক যোগাযোগসচিব ও যোগাযোগমন্ত্রী মতিউর রহমান সেই ৯০-এর দশকের প্রথম দিকে একটা সেমিনারে বক্তৃতায় বলেছিলেন, উন্নয়নের তিনটি পূর্ব শর্ত হচ্ছে, যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও সেচ। ছোট্ট এক লাইনের তিনটি শব্দ পরে চিন্তা করে দেখলাম, আসলেই এই তিনটি ব্যবস্থা যদি কোনো দেশে যথাযথভাবে চালু থাকে, তাহলে উন্নয়ন না হয়ে উপায় নেই। যেহেতু আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান, সেই জন্য মতিউর রহমান সেচের ওপরে জোর দিয়েছিলেন। যোগাযোগ ও বিদ্যুৎব্যবস্থা যে অপরিহার্য, তা এখন আমরা হারে হারে টের পাচ্ছি।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হওয়ার পর লেনিনও একই কথা বলেছিলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের অগ্রগতির জন্য তিনটি জিনিসের দরকার। যথা— যোগাযোগব্যবস্থা, সোভিয়েতস অর্থাৎ বলশেভিকদের রাষ্ট্রক্ষমতা এবং সারা সোভিয়েত ইউনিয়নে ইলেকট্র্রিফিকেশন। সেই ১৯১৭ সালের দিকে তিনি এ কথা বলেছিলেন। এখনো সে কথাটি কতটা বাস্তবধর্মী। যোগাযোগ ও বিদ্যুৎব্যবস্থায় সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। সেই পথ ধরেই ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়াকে বর্তমানে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন, পেছনের সবকিছু যদি বাদও দিই।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জ্বালানি খাত
- সংকট উত্তরণ