পরিবর্তন কতটুকু হয়
জনগণ পরিবর্তন চাইছে। চাওয়া অনুযায়ী পরিবর্তন কতটুকু হয় বা হচ্ছে, সেই বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে, পরিবর্তন চাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। তারপরও জনগণ পরিবর্তন চায়। এককথায়, বেঁচে থাকার জন্য সহনীয় একটা রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা চায়, সমাজ চায়। এই পরিবর্তন চাওয়া কিন্তু নতুন নয়, বহু পেছনের। যুগ যুগ ধরে জনগণ পরিবর্তন চাইছে, এ পরিবর্তন চাওয়া যুগ যুগ ধরে চলে আসা বিদ্যমান বৈষম্যের বিরুদ্ধে। পরিবর্তন চাওয়াই বলে দেয় যে জনগণ কখনোই শান্তিতে, নিরাপত্তার মধ্যে থাকছে না। কথিত নিরাপত্তা আদতে মানুষকে নিরাপদ করতে পারছে না। পাকিস্তান আমলে স্বাধিকার আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাগুলো বলে দেয় যে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ কতটা পরাধীন ছিল, অধিকারবঞ্চিত ছিল।
উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে একটা চূড়ান্ত পরিবর্তন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ একটা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমা তথা ভূখণ্ড পেয়েছিল। বাঙালি জাতি একটা সংবিধান পেয়েছিল। খুব বিচক্ষণতার সঙ্গে বলতে হয় যে একটা সংবিধান ও ভূখণ্ড এবং সার্বভৌমত্ব পেলেও জনগণ কিন্তু আশানুরূপভাবে একটা সহনশীল রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থাপনা পায়নি সেই অর্থে। ফলে জনগণ অতীতের মতোই অধিকারবঞ্চিত ও অনিরাপদই থেকে গেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, পাকিস্তান আমলে বাঙালি নারীদের ওপর যে বর্বরোচিত নৃশংস নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা কিন্তু একটা স্বাধীন রাষ্ট্রেও চলমান রয়ে গেছে এবং সেটা ব্যাপকভাবে। একজন কন্যাশিশু সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে নিরাপদ থাকতে পারছে না। এ রকম অসংখ্য উদাহরণ আছে অধিকার বঞ্চনার ক্ষেত্রেও। আবার রাষ্ট্র ভাষা বাংলা হলেও তার ব্যবহার কিন্তু মর্যাদাপূর্ণভাবে নেই। তেমন চেষ্টা আছে বলেও মনে হয় না।
একটা স্বাধীন রাষ্ট্র, একটি নিজস্ব সংবিধান পেলেও জনগণের পরিবর্তন চাওয়াটা কিন্তু থেমে নেই। কারণটাও স্পষ্ট যে জনগণ যা চেয়েছিল, চাইছে তা কিন্তু আজও পায়নি; স্বাধীনতা অর্জনের ৫৫ বছর হলেও সেটা সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, একটা স্বাধীন রাষ্ট্রে জনগণের পরাধীন ও অনিরাপদ থাকাটা। যাঁরা রাজনৈতিক দলের এবং কোনো না কোনো সময় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন, তাঁরা সাফল্যের ঢেকুর তুললেও কথাটা অযৌক্তিক নয় যে একটা নিরাপদ ও সহনশীল সমাজব্যবস্থা তাঁরা জনগণকে দিতে পারেননি। রাজনৈতিক ক্ষমতাসীনেরা নিজেদের দলকে যতটা শক্তিশালী করেছে, দলের স্বার্থ রক্ষা করেছে, নিজেদের আখের গুছিয়েছে, দেশ ও দেশের জনগণের জন্য ততটা করেনি, যেটুকু করেছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। এতে জনগণের সন্তুষ্টি আসেনি, নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়নি।
সাধারণ জনগণ কী চায়? জনগণ চায় সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা, মানব মর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকার। কথাটা মোটেও অযৌক্তিক নয় যে রাষ্ট্রে একটা শ্রেণি থাকছে, যারা জনগণের এই মৌলিক চাওয়াকে পুঁজি করে জন্ম নেয় ও বেড়ে ওঠে নিজেদের মতো করে। যারা একটা পর্যায়ে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক ব্যানারে তারা তৎপর হয়। বলাবাহুল্য যে এ রকম মতাদর্শের ভিন্নতা নিয়ে রাষ্ট্রে একের অধিক রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম হয়েছে, হচ্ছে। বৈষম্যের বিরোধিতা, সমতার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম হলেও আদতে এরা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক চর্চাকে সমর্থন করে, ক্ষমতায় আসীন হতে উন্মুখ হয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাংলাদেশের স্বাধীনতা