সন্ত্রাস-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বার্তা
আমাদের দেশে রাজনীতিতে একটা চিরকালীন নিয়ম আছে-নিজের দলের কেউ ধরা পড়লে সে ‘ষড়যন্ত্রের শিকার’, আর প্রতিপক্ষের কেউ ধরা পড়লে সে ‘দেশের শত্রু। এ সহজ হিসাবটা এতদিন বেশ চলে আসছিল; কিন্তু গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট আর ভাঙচুরের ঘটনার পর সেই পুরোনো হিসাবটা একটু এলোমেলো হয়ে গেল। কারণ এবার ধরা পড়লেন ঘরের লোক। অভিযোগ ও প্রমাণ এক বিষয় নয়। তবু স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কারণে একজন সংসদ-সদস্যকে পদত্যাগ করতে হলো। মে মাসে শপথ, অক্টোবরের প্রথম দিনে বিদায়। মাঝখানে মাত্র পাঁচ মাস। এমন দৃষ্টান্তমূলক ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক বিরল অধ্যায়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সচরাচর যা ঘটে, সেটা হলো-নিজের দলের কেউ অভিযুক্ত হলে প্রথমে অস্বীকার, তারপর সময়ক্ষেপণ, তারপর ‘দলীয় শৃঙ্খলা’ নামে বিষয়টি চাপা। এটাই আমাদের চেনা অভ্যাস। এবার সেটা ঘটেনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পরপরই নির্দেশ দিয়েছিলেন-অপরাধীকে তার রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিচার করা হবে না, অপরাধী হিসাবেই দেখা হবে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, দুর্নীতি আর সন্ত্রাসে আপস করা হবে না। সেই কথার একটা বাস্তব পরীক্ষায় সরকার কথা রাখার চেষ্টা করেছে। ঘরের লোককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি ছোট ব্যাপার নয়। কারণ আমাদের দেশে ক্ষমতায় এসে নিজের লোককে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানো কতটা কঠিন, সেটা সবাই জানি। ক্ষমতায় আসা কঠিন, কিন্তু ক্ষমতায় থেকে নিজের লোকের দিকে আয়না ধরা সম্ভবত তার চেয়েও কঠিন। সরকার সেই কঠিন কাজটা করার সাহস দেখিয়েছে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণে।
সরকার ক্ষমতায় এসেই স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছিল, সন্ত্রাস, দুর্নীতি আর সহিংসতার বিরুদ্ধে তাদের নীতি হবে ‘জিরো টলারেন্স’। শব্দটা আমাদের রাজনীতিতে বহুবার শোনা গেছে। নির্বাচনের আগে, সংকটের সময়ে, সংবাদ সম্মেলনে। কিন্তু শব্দটা আসল অর্থ পায় তখন, যখন ক্ষমতাসীন দলের নিজের লোকের ক্ষেত্রেও সেটা প্রয়োগ হয়। জিরো টলারেন্স মানে শুধু রাস্তায় অপরাধী ধরপাকড় নয়। এর আসল অর্থ হলো-যে রাজনৈতিক ছাতার নিচেই অপরাধী থাকুক, সেই ছাতা সরিয়ে দেওয়া। অপরাধের পরিকল্পনা কে করেছিল? কারা হামলা চালিয়েছিল? কারা টাকা বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিল? কারা জমি দখলের সুবিধা নিতে চেয়েছিল? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর বের করা হলেই ‘জিরো টলারেন্স’ একটা সুন্দর পোস্টারের মতো দেওয়ালে শোভা না পেয়ে বাস্তব চিত্র বদলে দেবে।
কিন্তু সন্ত্রাসকবলিত সংকুল পরিস্থিতি খুব সহজে বদলাবে বলে মনে করার কারণ নেই। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঠিক পরের রাতেই, ২৬ সেপ্টেম্বর, রাজধানীর ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীতে নিউগিনি প্রপার্টিজ প্রকল্পে প্রায় ৫০ জনের একটি দল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এলোপাতাড়ি ৫০টির মতো গুলি ছোড়া হয়, রামদা-ছোরা নিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। মামলায় ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে, এ পর্যন্ত সাতজন গ্রেফতার হয়েছেন-যাদের মধ্যে একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেলও আছেন। অর্থাৎ, এখানেও ক্ষমতা, প্রভাব আর সংগঠিত শক্তির ছায়া স্পষ্ট।
শুধু দুটি ঘটনা নয়, বাংলাদেশের কেন্দ্র ও প্রান্তে প্রান্তে এমন সন্ত্রাসী ঘটনা অহরহ ঘটছে। কিন্তু বেশিরভাগ ঘটনার ক্ষেত্রে প্রকৃত পরিকল্পনাকারী বা পৃষ্ঠপোষকরা আড়ালে থেকে যান। অথচ প্রকৃত জিরো টলারেন্সের অর্থ হলো-অপরাধী ও তার রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করা, যিনি নির্দেশ দিয়েছেন, যিনি অর্থ দিয়েছেন, যিনি জমি বা সুবিধার লোভে হামলাগুলোকে সমর্থন দিয়েছেন-সবাইকে আইনের আওতায় আনা। কিছু পদত্যাগ ও শাস্তি ভালো দৃষ্টান্ত। দলের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো এ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা সামনে এনেছে যে, ক্ষমতার নামে যা খুশি করার সুযোগ নেই।
- ট্যাগ:
- মতামত
- রাজনৈতিক সংস্কৃতি