চরম বৈষম্য আর কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি অস্থিরতা তৈরি করতে বাধ্য
ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান। সম্প্রতি ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, উন্নয়ন ও জননীতি নিয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে।
সরকার ক্ষমতায় আসার প্রায় সাত মাস পর দেশের অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল বলে মনে হচ্ছে?
মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক: অর্থনীতির কিছু জায়গায় উন্নতি হয়েছে, তবে স্থিতিশীলতার ভিত্তি এখনো দুর্বল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, বিনিময় হার তুলনামূলক স্থির হয়েছে এবং রেমিট্যান্স-প্রবাহ বহিস্থ খাতের প্রবাহের চাপ সামলাতে সহায়তা করছে। এসব ইতিবাচক পরিবর্তনের স্বীকৃতিও পাওয়া যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরে মুডিস বাংলাদেশের ঋণমানের আউটলুক ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করেছে। অর্থাৎ কিছু ঝুঁকি কমেছে, কিন্তু অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো রয়ে গেছে।
দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সঞ্চয় কমেছে। দুর্বল রয়ে গেছে বিনিয়োগ পরিস্থিতিও। এডিবি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করেছে। ব্যাংক খাতের চাপ ও জ্বালানির সংকট অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বড় বাধা হিসেবে থাকছে।
সামগ্রিক সঞ্চয়ের পরিসংখ্যানেও উদ্বেগ ধরা পড়ে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে দেশজ সঞ্চয় জিডিপির প্রায় ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে, আর জাতীয় সঞ্চয় প্রায় ৩০ শতাংশ থেকে ২৬ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে আয় ব্যয়ের সঙ্গে তাল রাখতে না পারলে পরিবারগুলোর পক্ষে সঞ্চয় ধরে রাখাও কঠিন হয়।
সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাবেও চাপ রয়েছে। রাজস্ব আহরণ ব্যয়ের প্রয়োজন মেটাতে পারছে না বলে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অক্টোবর-ডিসেম্বরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যাংকে পর্যাপ্ত তারল্য ও বেসরকারি ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকলে এর তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত হতে পারে। কিন্তু এই নির্ভরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে সুদ ব্যয় বাড়বে, প্রয়োজনীয় জনসেবায় ব্যয়ের সুযোগ কমবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ফিরতে শুরু করলে তার অর্থায়নেও চাপ পড়তে পারে।
অবশ্য মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির বাড়তি দাম এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা আমদানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে স্থিতিশীলতা ফেরানোর কাজ কঠিন করেছে।
ছয় মাসে দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তবে সংস্কারের দিকনির্দেশনা ও বাস্তব অগ্রগতি এই সময়েও মূল্যায়ন করা যায়। বিশেষ করে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশের পাশাপাশি ঋণ আদায়, মূলধন ঘাটতি মোকাবিলা ও দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠনে অগ্রগতি প্রয়োজন। কঠোর যাচাইয়ে আগে আড়ালে থাকা খেলাপি ঋণ বেরিয়ে আসা সংস্কারেরই অংশ; এরপর সেগুলোর নিষ্পত্তি কতটা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আমার মূল্যায়ন হলো, কিছু কিছুটা উন্নতি হয়েছে; সেটিকে টেকসই স্থিতিশীলতায় রূপ দিতে এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ এবং ব্যাংক সংস্কারে দৃশ্যমান ফল প্রয়োজন।
এই যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাণিজ্যনীতির কী রকম প্রভাব পড়ছে?
মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক: ইরান যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের যে পরিমাণ দাম বেড়েছে এবং জ্বালানির বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেটা কিন্তু আমাদের যে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস বা প্রচেষ্টা, সেটাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জ্বালানি তেলের যে মূল্য অ্যাডজাস্ট করা হয়েছে, এর একটা কশাঘাত সাধারণ মূল্যস্ফীতির ওপর পড়বে।
আমরা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইলেও বিশ্ববাজারের বর্তমান পরিস্থিতি এবং দেশের বিদ্যমান সংকট সার্বিক পরিবেশ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শীতকালে দেশে জ্বালানির চাহিদা গরমের তুলনায় কম হলেও ইউরোপের বাড়তি চাহিদার কারণে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশকে প্রধান ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।
যুদ্ধ ও মার্কিন বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দুই দিক থেকে চাপে ফেলছে। একদিকে আমদানি ও উৎপাদনের ব্যয় বাড়ছে; অন্যদিকে রপ্তানি আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির নিরন্তর পরিবর্তন ও তার উদ্বেগজনক গতিধারা বাংলাদেশকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ট্রাম্পের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল নীতি সারা বিশ্বে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে এবং এটা ব্যবসা ও রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হচ্ছে। কোভিড-পরবর্তী অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমলে পোশাক কেনার ব্যয় সংকুচিত হয়, যার প্রভাব পড়ে তৈরি পোশাকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। প্রধান দুটি বাজারের আমদানির চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১০২ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছিল, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে মাত্র ১০৪ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি ১০০ বিলিয়ন থেকে কমে ৮৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ একটি বাজারে আমদানি প্রায় স্থবির, অন্যটিতে সংকুচিত হয়েছে। বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ তৈরি পোশাকনির্ভর হওয়ায় এই পরিস্থিতিতে রপ্তানি আয় বাড়ানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঘন ঘন বাণিজ্যনীতি পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা। দেশের ভেতরেও গ্যাস-বিদ্যুতের অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত সরবরাহ এবং দীর্ঘদিনের অবকাঠামো ও পরিবহনসংক্রান্ত সমস্যা উৎপাদন ও সময়মতো পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা ব্যাহত করছে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়ানো জরুরি হলেও বৈদেশিক চাহিদার দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা একসঙ্গে সেই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তিতে মার্কিন পণ্য কেনা বাড়ানোর অঙ্গীকারও রয়েছে। নির্দিষ্ট উৎস থেকে কেনার এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রতিযোগিতামূলক দাম নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় সাশ্রয়ী সরবরাহকারী বেছে নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। বাইরের এসব চাপের মধ্যেও দেশের উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা ধরে রাখা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিটিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক: প্রথমত, চুক্তিটির প্রক্রিয়া ছিল অস্বচ্ছ। সাধারণত এ ধরনের আলোচনায় গোপনীয়তার শর্ত থাকে বলে সব তথ্য প্রকাশ্যে আনা যায় না। তবে সে ক্ষেত্রেও নেগোসিয়েশন টিমে বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করার একটি চর্চা রয়েছে, যাতে তাঁরা দর-কষাকষির প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন। সরকার এই চুক্তির ক্ষেত্রে সেই উদ্যোগও নেয়নি।
দ্বিতীয়ত, আমরা এখানে একটি অসম দর-কষাকষি দেখছি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করার সময় যদি তা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তবে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সীমিত পরিসরে হলেও পরামর্শ করা আবশ্যক ছিল, যাতে তাঁদের উদ্বেগের জায়গাগুলো বোঝা যেত। দুর্ভাগ্যবশত তা করা হয়নি; করা হলে দর-কষাকষির মান আরও অনেক উন্নত ও কার্যকর হতে পারত।
এটা ঠিক যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার হারানোর ভয়ে বেসরকারি খাত থেকেও দ্রুত চুক্তি করার একটি চাপ ছিল। ভূরাজনৈতিক সংকটের এমন সময়ে বেসরকারি খাত সব সময়ই বাজারসুবিধা বাড়ানোর কথা ভাববে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে—এমন সঠিক কৌশল নির্ধারণ করা সরকারের দায়িত্ব ছিল। তৎকালীন সরকার বিষয়টির গুরুত্ব যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারেনি।