কর্মসংস্থানে অদৃশ্য বাস্তবতা
শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি এখন আর চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না। প্রার্থীর দক্ষতা, সামাজিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক সক্ষমতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর নিয়োগব্যবস্থা, সব মিলিয়ে বদলে গেছে কর্মসংস্থানের বাস্তবতা। এ পরিবর্তনের সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে কেন জীবনবৃত্তান্ত আজ সাফল্যের গল্পের মাত্র অর্ধেক অংশ, তা দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
সাধারণত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের প্রক্রিয়াটিকে আমরা প্রায়শই শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের মানদণ্ডে বিচার করি। কিন্তু স্নাতকদের কেউ কেউ কেন সফলতার চূড়ায় পৌঁছান আর কেউ কেন তা অর্জনে ব্যর্থ হন, তা গভীরভাবে বুঝতে হলে আমাদের সমাজের কাঠামোগত বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। কর্মসংস্থান যোগ্যতা বা ‘এমপ্লয়েবিলিটি’ শুধু আপনি কতটুকু জানেন তার ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি একই সঙ্গে একটি জটিল সামাজিক বিন্যাস, যেখানে আপনার অবস্থান কোথায়, সেটিও একটি বড় বিষয়। বহু দশক ধরে শিক্ষাব্যবস্থার ‘সামাজিক চুক্তিটি’ ছিল খুবই সরল; মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করো, একটি ডিগ্রি অর্জন করো এবং সমাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই একটি নিশ্চিত ক্যারিয়ার তোমার জন্য অপেক্ষা করবে। পথটি ছিল সোজা এবং স্পষ্ট। কিন্তু বর্তমানে ‘এন্ট্রি লেভেল : ৫ বছরের অভিজ্ঞতা আবশ্যক’ লেখা বিজ্ঞাপনের সামনে হতাশ হয়ে বসে থাকা কোনো নবীন স্নাতককে জিজ্ঞাস করলে জানা যাবে, সেই সুনির্দিষ্ট পথটি এখন এক জটিল গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে। সিজিপিএ চার পেয়েও একজন কেন একটি সাক্ষাৎকারের সুযোগ পেতে হিমশিম খায়, অথচ তিন পাওয়া আরেকজন অনায়াসে করপোরেটজগতে জায়গা করে নেয়? এর উত্তর শুধু ‘ভাগ্য’ নয়। উত্তর লুকিয়ে রয়েছে সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটের এক অদৃশ্য স্তরে, যা নির্ধারণ করে দেয় কে চাকরি পাবে, কার পদোন্নতি হবে আর কে পেছনে পড়ে থাকবে। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একজন গ্র্যাজুয়েট বাজারে মূলত তিন ধরনের ‘সম্পদ’ নিয়ে আসেন। তবে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী শুধু প্রথমটির ওপরই জোর দেন, যেটি হলো ‘অর্জিত দক্ষতা’ বা ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’; এটি হলো শ্রেণিকক্ষে শেখা বিদ্যা, যেমন: আপনার কোডিং করার দক্ষতা, সামষ্টিক অর্থনীতির জ্ঞান কিংবা নার্সিংয়ের সনদ। দীর্ঘদিন এটুকুই চাকরি পাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এ সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা ডিগ্রি অর্জনের এক বিশাল জোয়ার দেখছি। যখন সবার কাছেই ডিগ্রি থাকে, তখন সেই ডিগ্রি হয়ে দাঁড়ায় একটি ‘সনদ’ মাত্র।
- ট্যাগ:
- মতামত
- কর্মসংস্থান