ককরোচ আন্দোলন : গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের শক্তি
ককরোচ-আরশোলা-তেলাপোকারা সৃষ্টির আদি থেকেই টিকে থাকার প্রতীক। ভারতের বেকার ও হতাশ যুব-তরুণ সমাজও বিলুপ্ত হওয়ার পথ বেছে না নিয়ে ককরোচ প্রতীকে থিকথিক করছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ছড়িয়ে পড়ে শহরে-বন্দরে। ফলে তাদের অন্যতম দাবি মেনে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। ক্ষমতাসীনরা ভয় পেয়ে বন্ধ করছে সাইবার জগৎ ও বাস্তবে আরশোলা ঢোকার যাবতীয় রাস্তা। কিন্তু আটকানো যায়নি তাদের। চারদিকে বেরিয়ে পড়ে ওরা। তৈরি হয় ম্যানিফেস্টো ও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে দল। তাদের দাবি : ‘আপনি যদি বেকার হন, সঙ্গে খানিক অলসও, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া স্যাভি ও সচেতন; তাহলে এ নতুন ‘রাজনৈতিক’ দল আপনাকে স্বাগত জানাবে, আপনিও আসুন আমাদের সঙ্গে লড়াইয়ের ময়দানে।’
ভারতে ককরোচ আন্দোলনের জন্ম ও উত্থান বেশ চমকপ্রদ। ১৫ মে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত শুনানি চলাকালীন খানিক রাগান্বিত হয়ে একটি মন্তব্য করেন, যা নিয়ে নিন্দার ঝড় বয়ে যায়। মন্তব্যটি ছিল, ‘দেশের (ভারত) যুব সম্প্রদায় খানিক আরশোলার মতো। যখন তারা চাকরি পেতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়াকর্মী কিংবা আরটিআই অ্যাকটিভিস্ট হয়ে যায়। এরাই সময়ে-অসময়ে সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে থাকে।’ এ মন্তব্য হিট স্প্রে-র মতো ছড়িয়ে পড়ে চাকরিহীন, হতাশ, দিশেহারা হাজার হাজার ছাত্র-তরুণ-যুবকের মধ্যে। আমেরিকা নিবাসী ৩০ বছরের অভিজিৎ দীপকে-ও নীরবে দেখছিলেন পুরো বিষয়টি। নামজাদা বস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে পাবলিক রিলেশনে স্নাতক তিনি। ছিলেন আম আদমি পার্টির সাবেক সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্ট। তিনি ঘটনাক্রম উপলব্ধি করে একটি টুইট করে বলেন, ‘কেমন হয়, যদি সব আরশোলারা একসঙ্গে জোট বাঁধে?’ এভাবে জনসমর্থন বাড়তে থাকে। আছড়ে পড়ে টুইটের পর টুইট। দ্রুতই অভিজিৎ একটি ডিজিটাল পার্টি তৈরি করেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে। তৈরি হয় ওয়েবসাইটও। অভিনব রাজনৈতিক দলটি ভারতের বেকার, অলস ও ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারকারী সব যুবকের দাবি নিয়ে কথা বলতে শুরু করে।
ভারতে আগেও উত্তাল রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিস্থিতিতে নতুন দল তৈরি হয়েছে। যেমন, আম আদমি পার্টির উত্থানও এরকম। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্না হাজারের প্রতিবাদ সামনে রেখে তৈরি হয় অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ঝকঝকে দলটি। কিন্তু ককরোচ জনতা পার্টির বিষয়টি নতুন হলেও পুরোপুরি আলাদা ও অনন্য। কারণ, এ মুহূর্তে সদস্য সংখ্যার নিরিখে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক্স ও ইনস্টাগ্রামে মোট ফলোয়ার সংখ্যাকে ককরোচ-কুল ছাপিয়ে গেছে মাত্র ৪ দিনে।
ভারতের ক্ষমতাসীনরা ভয়ের চোখে অবাক হয়ে দেখছে নতুন দলের দেশব্যাপী আন্দোলনকে। একইসঙ্গে আরশোলা বাড়লে তাকে পিষে মারার মতো লোকও বাড়ছে। বাড়ছে বিষাক্ত কীটনাশক প্রস্তুতকারী কোম্পানির সংখ্যা। তাই সাসপেন্ড করা হয়েছে ককরোচ জনতা পার্টির এক্স হ্যান্ডেল। বারবার হ্যাক করার চেষ্টা চলছে ইনস্টাগ্রাম। তৈরি হয়েছে অ্যান্টি-ককরোচ গ্যাং। যারা কখনো কনটেন্ট ক্রিয়েটরের ছদ্মবেশে পেজ হ্যাক করেছে। শারীরিক আক্রমণ করা হচ্ছে ফ্যাসিবাদী কায়দায়। তবুও থামানো যাচ্ছে না তাদের।
ভারতে বিজেপির শাসনে বিগত সাত বছরে ৬০ বারেরও বেশি নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। এ বছর আবারও। ছাত্রছাত্রীরা আগেও বিক্ষোভ দেখিয়েছে রাজপথে। তবু কিচ্ছু বদলায়নি। হতাশ যুব সম্প্রদায় দেখেছে, বিরোধী শিবিরের ন্যূনতম কার্যক্রমে অপরিবর্তিতই থেকেছে তাদের ভাগ্য। তারা তাই ডিজিটাল অভ্যুত্থানের পথ বেছে নিয়েছেন। দিল্লি থেকে যা ভারতের প্রধান শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুতবেগে। উন্নাসিক মোদি সরকার প্রথমে গ্রাহ্য না করলেও এখন টের পাচ্ছে গদি রক্ষার গরজ। কারণ, ককরোচ জনতা পার্টি যেসব দাবি উত্থাপন করেছে, তা ভারতের গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ ও অসাম্প্রদায়িকতার দাবি, যা মোদি সরকার সংখ্যাগুরু উগ্র হিন্দুত্ববাদের নামে পদদলিত করে আসছিল সংখ্যালঘু, মুসলিম, নিম্নবর্গকে ঘর, বাড়ি, নাগরিকতা থেকে পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করার মাধ্যমে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শিক্ষার্থীদের আন্দোলন