আবু সাঈদের উন্মুক্ত দুই হাত ও আমাদের গণতান্ত্রিক কল্পনা

প্রথম আলো ড. কাজী মারুফুল ইসলাম প্রকাশিত: ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:৫০

ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো কোনো ভাষণের মাধ্যমে নয়; একটি দৃশ্যের মাধ্যমে জাতির স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে যায়। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বুক উন্মুক্ত করে, দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে ছিলেন সশস্ত্র রাষ্ট্রের মুখোমুখি। একটার পর একটা গুলি। তারপর মৃত্যু। কিন্তু সেই মুহূর্তের যে ছবি, তা আর কেবল একজন তরুণের ছবি থাকেনি; সেটি পরিণত হয়েছে প্রতিবাদ, সাহস, আত্মত্যাগ এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার এক শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীকে।


দুই বছর পেরিয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক চর্চাকে পুনর্গঠনের কঠিন পথে হাঁটছে। আশা, হতাশা, বিতর্ক, রাজনৈতিক সমঝোতা, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ও তার ভাঙনের মধ্য দিয়ে আমরা এক অনিশ্চিত সময় অতিক্রম করছি। কিন্তু এই সব ওঠানামার মাঝেও আবু সাঈদের ছবিটি আমাদের সামনে বারবার ফিরে আসে। কারণ, কিছু ছবি শুধু অতীতকে ধারণ করে না; তারা ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তোলে।


আমরা প্রায়ই রাজনীতিকে সংসদ, নির্বাচন বা ক্ষমতার করিডরে সীমাবদ্ধ করে দেখি। অথচ রাজনীতি মানুষের কল্পনাতেও ঘটে। আমরা কী দেখি, কীভাবে দেখি এবং কী মনে রাখি—এসবের মধ্যেও ক্ষমতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আন্তোনিও গ্রামসি বলেছিলেন, ক্ষমতা শুধু জোর করে টিকে থাকে না; মানুষের সম্মতি ও কল্পনাকেও নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ রাষ্ট্র ও শাসকগোষ্ঠী শুধু আইন নয়, মানুষের চিন্তার জগৎও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কোন ঘটনা ‘শৃঙ্খলা রক্ষা’ আর কোন ঘটনা ‘দমন-পীড়ন’—এই অর্থ নির্ধারণের লড়াইটাই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের লড়াই।


আবু সাঈদের ছবিটি সেই আধিপত্যে একটি ফাটল তৈরি করেছিল। একজন নিরস্ত্র তরুণের উন্মুক্ত দুই হাত রাষ্ট্রের সহিংসতার সামনে এমন এক নৈতিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল, যার উত্তর বন্দুক দিয়ে দেওয়া যায় না।


ব্রিটিশ সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক স্টুয়ার্ট হল বলেছিলেন, ছবি কখনো বাস্তবতার নিছক প্রতিফলন নয়; ছবি বাস্তবতার অর্থ নির্মাণ করে। অর্থাৎ আমরা কোনো ছবি দেখে শুধু একটি ঘটনা দেখি না, সেই ঘটনার ব্যাখ্যাও তৈরি করি। আবু সাঈদের ছবিটি আমাদের সামনে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে বাধ্য করেছে।


আবু সাঈদের ছবির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো তাঁর দেহভঙ্গি। দুই হাত প্রসারিত, বুক খোলা, সামনে এগিয়ে যাওয়া। এটি আত্মসমর্পণের ভঙ্গি নয়; আবার আক্রমণেরও নয়। এটি একধরনের নৈতিক অবাধ্যতা। দার্শনিক জুডিথ বাটলার দেখিয়েছেন, মানুষের দেহও রাজনৈতিক ভাষা হয়ে উঠতে পারে। কোনো মানুষ যখন জনসমক্ষে নিজের দেহ নিয়ে দাঁড়ায়, তখন সে কেবল ব্যক্তি হিসেবে নয়, একটি রাজনৈতিক দাবি নিয়েও হাজির হয়। এ কারণেই ছবিটি এত দ্রুত মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। এ ছবি সাহসের দৃশ্যমান রূপ। সাহস সংক্রামক। প্রতিবাদও সংক্রামক।


বিশ্ব ইতিহাসে কিছু ছবি যুগের নৈতিক সংকটকে ধারণ করেছে। নূর হোসেনের ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লেখা খোলা বুক, ভিয়েতনামে নাপাম বোমায় দগ্ধ শিশুর দৌড়, তিয়েনআনমেন স্কয়ারে ট্যাংকের সামনে দাঁড়ানো অজ্ঞাত তরুণ কিংবা জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ভিডিও—এসব দৃশ্য মানুষকে শুধু তথ্য দেয়নি; অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে।


ফরাসি দার্শনিক জাক রঁসিয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিয়েছিলেন, ‘কে দৃশ্যমান হবে, কার কণ্ঠ শোনা যাবে, কোন যন্ত্রণা রাজনৈতিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবে’—এটাই ক্ষমতার একটি বড় প্রশ্ন। আবু সাঈদের ছবি এমন একজন তরুণকে দৃশ্যমান করেছিল, যিনি সাধারণত রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে অবস্থান করেন। সেই দৃশ্যমানতাই আন্দোলনকে নতুন নৈতিক শক্তি দেয়।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও