সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক প্রবেশিকা পরীক্ষার একটি প্রশ্ন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুব আলোচনা হচ্ছে। সে পরীক্ষায় ১০টি নিবন্ধের মধ্যে ১টি নিবন্ধ উত্তর দেওয়ার নির্দেশনা ছিল। এ ছাড়া ছিল তিনটি বিষয়ে টীকা লেখা এবং একটি উদ্ধৃতির বিষয়ে নিজের ভাবনা জানানো। এটাই তাদের পরীক্ষা। নিবন্ধের যে তালিকা ছিল খুব চিত্তাকর্ষক—
ক. সাহিত্যে-পড়া বা সিনেমায়-দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী নারী-চরিত্র
খ. তোমার ছোটবেলাকার ইচ্ছেগুলো, খামখেয়ালগুলো
গ. ‘পথের পাঁচালী’র দুর্গার সঙ্গে তোমার এক কাল্পনিক ট্রেন-সফর
ঘ. উত্তমকুমার ‘বনাম’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
ঙ. প্রিয় সাহিত্যিকের উদ্দেশ্যে লেখা তোমার খোলা-চিঠি
চ. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: সুখের কথা, ভয়ের কথা
ছ. যে-বইটি তোমার প্রিয়জনকে উপহার দিতে চাও
জ. সাহিত্যিকের আড্ডা: বৈকুণ্ঠ মল্লিক, লালমোহন গাঙ্গুলী, সত্যজিৎ রায়
ঝ. যে-জঙ্গল কেটে ফেলা হচ্ছে তার পাখিদের কথোপকথন
ঞ. ঈশ্বরকে যদি গুটিকয় প্রশ্ন করার সুযোগ পেতে...
অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন এ প্রশ্নের পাশে রেখে হাসিঠাট্টা করেছেন। দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন পাশাপাশি রাখলে একটি দারুণ সত্য বেরিয়ে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বাংলা বিষয়ে সন্ধি–কারক–বিভক্তির মতো ভাষার খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে বেশ জোর দেওয়া হয়েছে। এতে পরীক্ষার্থীর ভাষার বিশেষ বিশেষ শাখায় কী দক্ষতা আছে, তা মূল্যায়নে আনা হয়েছে।
এটা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, আমাদের মূল্যায়নের প্রতিটি স্তরে ছোট ছোট দক্ষতা বা অণুদক্ষতা নিয়ে অধিক জোর দেওয়া হয়। ফলে অনেক ভালো সন্ধি–সমাস–কারক–বিভক্তি জানার পরও শিক্ষার্থীরা শুদ্ধভাবে একটি বাংলা বাক্য লিখতে পারে না। সৃজনশীলভাবে মনের ভাব প্রকাশ তো দিল্লি হনুজ দূর অস্ত।
পক্ষান্তরে যাদবপুরের প্রশ্নে এই অণুদক্ষতা নিয়ে কোনো আগ্রহই দেখা যায় না; বরং স্বীয় চিন্তনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্বাধীনভাবে কিছু রচনাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। সেখানে আগে থেকে মাথা ভরে নিয়ে আসা তথ্যের ঝাঁকা খাতায় ঢেলে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। ১টি প্রশ্ন উত্তর দেওয়ার জন্য ১০টি বিকল্প দেওয়া হয়েছে। যাতে কারও আগ্রহের ক্ষেত্র বাদ না পড়ে।
বাংলাদেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন দেখলে প্রথমেই একজন শিক্ষার্থীর মনে একটা অপরাধবোধ জাগ্রত হয়। নিজেকে মনে মনে দুয়ো দেয়, ইশ্, আরেকটু ভালো করে পড়লাম না কেন! প্রশ্ন পরীক্ষার্থীর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। প্রশ্ন যেন করাই হয়েছে পরীক্ষার্থীর অক্ষমতাকে প্রকাশ করার জন্য। পক্ষান্তরে যাদবপুরের প্রশ্নে স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত একজন শিক্ষার্থী যেকোনো একটি বিষয়ে অনায়াসে লিখতে পারবে। তার মধ্যে অজ্ঞানতার অপরাধবোধ জাগ্রত হবে না।