সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব
বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব অনেক আগে থেকেই। প্রায় প্রতিবছরেই কমবেশি ডেঙ্গু জ্বর হয়ে থাকে। এই শতাব্দীর শুরুতে ২০০০ সালে ডেঙ্গুজ্বর বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা সবার নজরে আসে। মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা আর অনেক মৃত্যু সাধারণ জনগণের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ডেঙ্গুজ্বর বলতে অনেকেই নিশ্চিত মৃত্যু মনে করতে থাকে। শুরু হয় রক্ত ও প্লেটিলেট দেওয়া আর এন্টিবডি পরীক্ষার হিরিক।
চলতি বছর সারা দেশে বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু রোগের পরিস্থিতি ভয়াবহতার আভাস দিচ্ছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ছুটে যাচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনে রাজধানীসহ সারা দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টির ধরন পালটে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণসহ নানা কারণে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ছে। বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সহ ছোট বড় ক্লিনিকে অসংখ্য রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে এবং অনেক রোগী ডেঙ্গু পরীক্ষা করে বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রতিবার ডেঙ্গুর সংক্রমণ একই সময়ে ফিরে আসছে, কমবেশি সারা বছর চলছে এবং আমরা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছি। ডেঙ্গু বাংলাদেশে নতুন কোনো রোগ নয়, আমরা ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়ছি। তবে ২০১৯, ২০২০, ২০২১, ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ থেকে এর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। এখন ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হচ্ছে টিকা বা ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা। ডেঙ্গুজ্বরের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, নেই কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধও। টিকা বা ভ্যাকসিনই ডেঙ্গু প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকরী ব্যবস্থা। এখন অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, করোনা মহামারি শুরুর মাত্র এক বছরের মাথায় আমরা এর টিকা পেয়ে গেলাম। সারা বিশ্বের মানুষই করোনা টিকার আওতায় এসেছে। কিন্তু ডেঙ্গু এত বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রকোপ ছড়ালেও কেন এখনো এর টিকা সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া অনেকেই জানতে চায়, আমাদের দেশে ডেঙ্গুর কোনো টিকা দেওয়া হয় কি না বা আসলেই অতি দ্রুত সময়ে টিকা দেওয়া হবে কিনা।
এ বিষয়ে বলতে গেলে ডেঙ্গুর টিকা যে একেবারে নেই তা নয়। শুরুর দিকে ডেঙ্গুর কিছু কিছু টিকা বা ভ্যাকসিন তৈরি হয়েছিল। দেখা যায়, ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধানত চার ধরনের সেরোটাইপ রয়েছে। সেরোটাইপ ১, ২, ৩ ও ৪। ইতিপূর্বে এমন কোনো কার্যকরী টিকা বা ভ্যাকসিন বের হয়নি যা এই চারটা সেরোটাইপের বিপক্ষেই কাজ করবে। এর পরও যে সব টিকা এখন ব্যবহার করা হচ্ছে, তার কার্যকারিতা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। যদিও ডেঙ্গুর টিকা তৈরি করতে অনেক বছর ধরেই চেষ্টা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে দুটি টিকা কিন্তু বের হয়েছেও, একটি ডেংভ্যাক্সিয়া (Dengvaxia) ভ্যাকসিন, আরেকটি কিউডেঙ্গা (Qdenga) ভ্যাকসিন।
ডেংভ্যাক্সিয়া (Dengvaxia): ডেংভ্যাক্সিয়া টিকাটি বের করেছে ফ্রান্সের একটি ওষুধ কোম্পানি। এই টিকাটির প্রয়োগে শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, কিন্তু সেল মেডিয়েটেড ইমিউনিটি তৈরি হয় না। এর ফলে এই টিকাটি নেওয়ার পরে ডেঙ্গু ভাইরাসে সংক্রমিত হলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গু মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। কেন এমন হয় তা পরিষ্কার নয়, তবে এই ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াকে বলে এন্টিবডি ডিপেন্ডেন্ট এনহান্সমেন্ট।
সাধারণত ডেংভ্যাক্সিয়া তিনটা ডোজে দিতে হয় ছয় মাস পরপর। কিন্তু এই ভ্যাকসিনটি সবাইকে দেওয়া যায় না। সাধারণত ৯ থেকে ১৬ বছরের বাচ্চাদের দেওয়া হয়, অর্থাৎ ৯ বছরের নিচে এবং ১৬ বছরের ওপরে যারা, তাদের কেউই এই টিকা নিতে পারবে না। এছাড়া ঢালাওভাবেও এই টিকা সবাইকে দেওয়া যায় না। যাদের একবারও ডেঙ্গু হয়নি, তাদের এই টিকা দেওয়া যাবে না। সাধারণত যাদের রক্ত টেস্ট করে ডেঙ্গু পজিটিভ এন্টিবডি পাওয়া যায় বা আগে কখনো ডেঙ্গু হয়েছিল, এমন মানুষদেরই টিকাটি দেওয়া যায়। এর বাইরে কাউকে এই টিকা দেওয়া যায় না। টিকাটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ রকম সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পূর্বে কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হলে এবং ভুলক্রমে তাকে এই টিকা দেওয়া হলে মারাত্মক জটিলতার সম্ভাবনা থেকে যায়। উপরন্তু যারা পূর্বে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়নি (সেরোনেগেটিভ), তাদের জন্য এই ভ্যাকসিনটি নিরাপদ নয়।