কাস্পিয়ান জুয়া : বদলে দিতে পারে অনেক সমীকরণ
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে। এতদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দুটি প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র বা সংঘাতের অক্ষ আলাদাভাবে আলোচিত হয়ে আসছিল, একটি পূর্ব ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, অন্যটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরাইল-ইরান তীব্র মুখোমুখি অবস্থান।
কিন্তু কাস্পিয়ান সাগরের বুকে রাশিয়া থেকে লোহা বহনকারী একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলা শুধু একটি সামরিক পদক্ষেপ ছিল না; এটি ছিল বিশ্বরাজনীতির নতুন দাবা খেলায় একটি বড় ধরনের জুয়া। কাস্পিয়ানের এ অস্থিতিশীলতা রাশিয়া, ইরান, ইউক্রেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের স্বার্থ ও কৌশলকে প্রভাবিত করছে। ঝুঁকিটা বড়ভাবেই নিয়েছে ইসরাইল। খেলাটাও শুরু হয়েছে তার হাত দিয়ে।
গত ২৫ জুলাই কাস্পিয়ান সাগরে বাণিজ্য তরী আন্নার ওপর হামলার ঘটনাটি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মোড়। ঘটনার পরপরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি একে ‘ইসরাইলের উসকানিতে ইউরোপকে যুদ্ধে টেনে আনার জন্য জাতিসংঘ সনদের এক সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেন। যদিও এ বিষয়ে ইসরাইল কৌশলগত নীরবতা পালন করে এমন ভাব ধরে, যেন সে এর কিছুই জানে না।
এর জবাবে ইরান প্রথমে ইউক্রেনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। তবে কিয়েভের পক্ষ থেকে কূটনৈতিকভাবে দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চাওয়ার পর তেহরান আপাতত সামরিক হামলা স্থগিত রাখে। তা সত্ত্বেও, প্রাণঘাতী ক্ষতিপূরণের দাবি এবং উত্তেজনার রেশ এখনো রয়ে গেছে। যে কোনো সময় তা বিস্ফোরিত হতে পারে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফটের সহ-সভাপতি এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ট্রিতা পার্সির মতে, ইরানি জাহাজে ইউক্রেনের হামলাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ইসরাইলের পরিকল্পনায় ইউক্রেনের এক দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক চাল। এর ফলে ইউক্রেনের অস্ত্র ঘাটতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসবে, ইরান যুদ্ধে জড়িত হওয়ার কারণে ইউক্রেনের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যে মনোযোগ সরে গিয়েছিল, তা ফিরে আসবে। আর কাস্পিয়ান সাগরে যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে আসবে। রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে একসঙ্গে নামবে ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র অক্ষ।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরাইল-ইরান সংঘাত তীব্র হওয়ার কারণে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মনোযোগ এবং মার্কিন সামরিক সহায়তা ইউক্রেন থেকে সরে আসছিল। উদাহরণস্বরূপ, ইউক্রেনের জন্য নির্ধারিত অনেক গোলাবারুদ এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি ফেরত নিয়ে ইসরাইলকে দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি প্রশাসন মনে করছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে দুই যুদ্ধকে এক করতে পারলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন যুদ্ধে আরও গভীরভাবে জড়াতে বাধ্য হবে। ইউক্রেন বার্তা দিতে চায়, ‘আমরা মধ্যপ্রাচ্যে আপনার শত্রু ইরানের বিরুদ্ধে লড়ছি, তাই আপনি ইউক্রেনে আমাদের সাহায্য করুন।’ কিয়েভের যুক্তি হলো, রাশিয়ার যুদ্ধ শুধু ইউক্রেনের বিরুদ্ধে নয়; ইরান, উত্তর কোরিয়া ও অন্য রাষ্ট্রের সহযোগিতায় এটি বৃহত্তর স্বৈরতান্ত্রিক জোটের চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।