শতভাগ জিপিএ-৫: বিদ্যালয়ের সাফল্যের পূর্ণ মাপকাঠি কী?
এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের শিক্ষার্থীদের শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জনের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি থেকে টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪৮৯ জনের মধ্যে ৩৮২ জন চূড়ান্ত এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পান এবং তাদের সবাই জিপিএ-৫ অর্জন করেন। নিঃসন্দেহে এমন ফল প্রশংসনীয়। ৩৮২ পরীক্ষার্থীর সবার সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়া, যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য গর্বের বিষয়। তবে একই সঙ্গে টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বড় অংশ কেন শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি, ওই প্রশ্ন সামনে এলে আলোচনাটি আর শুধু কোনো বিদ্যালয়ের ফলাফল কিংবা টেস্ট পরীক্ষার কঠোরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন মূল প্রশ্ন হয়ে ওঠে, বিদ্যালয়ের শিক্ষা-সাফল্য আসলে কীভাবে পরিমাপ করা উচিত?
বাংলাদেশে দীর্ঘ দিন ধরেই বিদ্যালয়ের মান বিচারের প্রধান সূচক ধরা হয় পরীক্ষার ফলকে। কতজন জিপিএ-৫ পেল, পাসের হার কত কিংবা ভালো কলেজে কতজন সুযোগ পেল; অভিভাবকদের কাছে এসব পরিসংখ্যানই প্রতিষ্ঠানের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। ফলে ভালো ফলের চাপ তৈরি হয় স্কুলের ওপরও। যত বেশি জিপিএ-৫, তত বেশি সুনাম; আর সুনাম বাড়লে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগ্রহও বাড়ে। এ বছর সারা দেশে ৬৬৯টি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী পাস করেছে। তবে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুলের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান যেভাবে টেস্ট পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে মূল পরীক্ষায় বসা থেকে বিরত রেখেছে, তা শিক্ষার সাফল্য মূল্যায়নের প্রচলিত ধারণা নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ তৈরি করেছে। কারণ, জিপিএ-৫ আর প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার এই তীব্র প্রতিযোগিতা অনেক সময় শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যকেই আড়ালে ঠেলে দেয়।
তবে টেস্ট পরীক্ষার গুরুত্বকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কেবল ফরম পূরণ করিয়ে শিক্ষার্থীদের বোর্ড পরীক্ষায় পাঠিয়ে দিলে বিদ্যালয়ের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থী কতটা প্রস্তুত, তার মৌলিক জ্ঞানের ভিত কতটা শক্ত কিংবা কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং তা পূরণে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এসব পরখ করা জরুরি। ওই বিবেচনায় টেস্ট পরীক্ষা একটি কার্যকর মূল্যায়ন পদ্ধতি হতে পারে। সারা বছর ঢিলেঢালা পড়াশোনার পর কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই বোর্ড পরীক্ষায় বসার সুযোগ দিলে শিক্ষার সার্বিক মান বজায় রাখা কঠিন।
সমস্যা বাঁধে তখনই, যখন টেস্ট পরীক্ষাকে দুর্বল শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নের হাতিয়ার না বানিয়ে স্কুলের পাসের হার বা জিপিএ-৫ এর সংখ্যা উঁচু রাখার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শিক্ষার মূল কাজ সেরা শিক্ষার্থী বাছাই করে চমকপ্রদ ফল দেখানো নয়; বরং বিভিন্ন স্তরের মেধাবীদের নিজ নিজ সম্ভাবনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া। তাই টেস্টে খারাপ করা শিক্ষার্থীকে মূল পরীক্ষা থেকে বাদ দেওয়ার আগে দেখা প্রয়োজন, তার দুর্বলতার পেছনের কারণ কী এবং তার উন্নতির পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না।
অতিরিক্ত ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক সহায়তা, শিক্ষকদের পরামর্শ, অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা এবং পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ থাকা দরকার। এসব উদ্যোগের পরও যদি শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত মান স্পর্শ করতে না পারে, কেবল তখনই তাকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় না পাঠানোর সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত হতে পারে। তখন এই কঠোরতাকে শাস্তি নয়, বরং একাডেমিক মান ধরে রাখার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়। তাই কঠোর সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় সহায়তার মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এই দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব তুলে ধরে। ফিনল্যান্ডে শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি মূল্যায়নে শিক্ষকের ধারাবাহিক মূল্যায়নকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। সেখানে মূল্যায়নের মূল উদ্দেশ্য কে ভালো আর কে দুর্বল ওই বিভাজন তৈরি করা নয়; বরং শিক্ষার্থী কোন অবস্থায় আছে এবং তাকে কীভাবে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশেও পরীক্ষার ফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর এই ধারাবাহিক অগ্রগতিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।