এআই ডেটা সেন্টারে পরিবেশবাদীদের আপত্তি কেন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে পৃথিবীজুড়ে নতুন ধরনের হার্ডওয়্যার অবকাঠামো গড়ে উঠছে। নাম ডেটা সেন্টার। বাইরে থেকে দেখলে এগুলো আর দশটি আধুনিক ভবনের মতোই। নেই ধোঁয়া, চিমনি, বড় কোনো শিল্প-কারখানার দৃশ্যমান দূষণ। কিন্তু এই নীরব স্থাপনাগুলোর ভেতরে দিনরাত চলছে হাজার হাজার শক্তিশালী সার্ভার। তাদের চালাতে লাগে বিপুল বিদ্যুৎ, আর ঠাণ্ডা রাখতে লাগে পানি। ফলে যে অবকাঠামোকে ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি বলা হচ্ছে, সেটিই এখন পানি, বিদ্যুৎ, জমি ও পরিবেশ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
বাংলাদেশও সেই বাস্তবতার বাইরে নেই, বরং আমাদের জন্য প্রশ্নটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে দেশে রাজধানীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর দু-তিন মিটার করে নেমে যাচ্ছে, যে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো প্রধানত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর, সেখানে পানি ও বিদ্যুৎ নিবিড় ডেটা সেন্টার স্থাপনের আগে কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া দরকার। বিদেশি বিনিয়োগ কত ডলারের, শুধু সেটিই বিবেচনার বিষয় হতে পারে না। দেখতে হবে সেই বিনিয়োগের প্রকৃত মূল্য কে দেবে।
ডেটা সেন্টার নিয়ে উদ্বেগ কেন : আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাবে, ২০২৪ সালে বিশ্বের ডেটা সেন্টারগুলো প্রায় ৪১৫ টেরাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে। এটি বৈশ্বিক মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় দেড় শতাংশ। এই চাহিদা প্রতিবছর প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বাড়তে থাকলে ২০৩০ সালে তা ৯৪৫ টেরাওয়াট ঘণ্টায় পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।
ডেটা সেন্টারের ভেতরে সারিবদ্ধভাবে বসানো থাকে হাজার হাজার সার্ভার, যেগুলো বছরের ৩৬৫ দিন দিনরাত সচল থেকে বিপুল পরিমাণ তাপ উৎপন্ন করে। এআইয়ের বিস্তার এই চাপ আরো বাড়িয়েছে। এআইয়ের জন্য ব্যবহৃত চিপ সাধারণ সার্ভারের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ হিসাব করতে গিয়ে এগুলো প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। সেই তাপ সরাতে প্রয়োজন হয় শক্তিশালী কুলিং ব্যবস্থা। আর কুলিং মানেই অনেক ক্ষেত্রে পানি ও বিদ্যুতের বাড়তি ব্যবহার। তাই নতুন ডেটা সেন্টার যেখানে তৈরি হচ্ছে, সেখানেই স্থানীয় মানুষের প্রশ্ন উঠছে—এই পানি কি মানুষের জন্য, কৃষির জন্য, নাকি সার্ভার ঠাণ্ডা রাখার জন্য?
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে। কানাডার ভ্যাংকুভারেও পরিবেশবাদী ও স্থানীয় বাসিন্দারা আন্দোলন করেছে। জমি অধিগ্রহণ, শব্দদূষণ, বন্য প্রাণীর আবাসস্থলে হস্তক্ষেপ এবং পানি-বিদ্যুতের ওপর চাপ নিয়ে তাদের উদ্বেগ। এমনকি ডেটা সেন্টারের কারণে স্থানীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গবেষণায় গত দুই দশকের উপগ্রহ তথ্য বিশ্লেষণ করে আশপাশের এলাকার ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ার প্রবণতা পাওয়া গেছে। চালু হওয়ার পর আশপাশের এলাকার ভূপৃষ্ঠ তাপমাত্রা গড়ে প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িয়ে দেয় একেকটি এআই ডেটা সেন্টার, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যা ৯ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছে। গবেষকরা এর নাম দিয়েছেন ‘ডেটা হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’। অর্থাৎ ডিজিটাল অর্থনীতির এই নতুন অবকাঠামোর পরিবেশগত মূল্য একেবারে অদৃশ্য নয়।
ভারতে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বিতর্ক বাংলাদেশের জন্যও কেন গুরুত্বপূর্ণ : ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের বিশাখাপত্তনমে গুগল ও আদানি গ্রুপ মিলে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ‘ডেটা সেন্টার হাব’ তৈরি করছে। প্রকল্পটিকে রাজ্য সরকার ঐতিহাসিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে। কর্মসংস্থানের বড় প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। কিন্তু স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর প্রশ্ন অন্য জায়গায়। শহরটির প্রতিদিনের পানির চাহিদা প্রায় ৪৮ কোটি লিটার, বিপরীতে সরবরাহ ৪১ কোটি লিটারের কিছু বেশি। পানি রেশনিংও সেখানে নিয়মিত ঘটনা। এমন একটি শহরে দীর্ঘ মেয়াদে একটি বিশাল ডেটা সেন্টার প্রকল্পকে পানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্পের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও হয়েছে। অভিযোগ, কাছাকাছি জলাধার ও গ্রামীণ পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। গুগল ও রাজ্য সরকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। উন্নত কুলিং প্রযুক্তির মাধ্যমে পানিসম্পদ সুরক্ষিত রাখার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।