অর্থনীতির অদেখা ভুবন: পুষ্টি, পুঁজি ও মানুষের শ্রম
অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তকে প্রবৃদ্ধি মাপা হয় জিডিপি, মাথাপিছু আয় ও রপ্তানি পণ্যের সংখ্যা দিয়ে। রবার্ট ফোগেল ১৯৯৩ সালের নোবেলজয়ী ও ক্লায়োমেট্রিক্সের জনক। কিন্তু তিনি ভিন্ন কথা বলেছেন, ‘মানুষের স্বাস্থ্যের দিকে দৃষ্টি দাও’। উচ্চতা, ওজন, পুষ্টি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা—এগুলো শুধু স্বাস্থ্যের সূচক নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ফোগেল গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে মানুষের শারীরিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের প্রকৃত গল্প বোঝা যায়। ১৭০০ শতাব্দীর ইংরেজ পুরুষের গড় উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির নিচে। বিংশ শতাব্দীতে এসে তা হলো ৫ ফুট ১০ ইঞ্চির বেশি। এই পরিবর্তন কোনো জেনেটিক বিবর্তন নয়—এটি খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টি, শ্রমের ধরন এবং রোগ থেকে মুক্তির ফলাফল। বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেট এবং অর্থনীতির অগ্রগতির ইতিহাস নিয়ে পড়তে বসলে অনেক লুকানো তথ্য সামনে চলে আসে।
ক্লায়োমেট্রিক্স কী এবং কেন এটি প্রাসঙ্গিক?
ফোগেল ও ডগলাস নর্থ যৌথভাবে অর্থনীতির একটি নতুন শাখা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন—ক্লায়োমেট্রিক্স বা নতুন অর্থনৈতিক ইতিহাস। এর মূল কথা হলো, ঐতিহাসিক তথ্য ও পরিসংখ্যানকে অর্থনৈতিক তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে বিশ্লেষণ করা। শুধু সংখ্যা নয়, সেই সংখ্যার পেছনে মানুষের জীবনের গল্প খোঁজা ছিল এই তত্ত্বের মূল বিষয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বিশ্লেষণে সাধারণত এই ক্লায়োমেট্রিক্স দৃষ্টিভঙ্গি থাকে না। বলা হয়, স্বাস্থ্য খাতে এত হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষায় এতটুকু। কিন্তু প্রশ্ন করা হয় না, এই বরাদ্দ বাংলাদেশের মানুষের গড় উচ্চতা, পুষ্টিমান, কার্যক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতায় কতটুকু পরিবর্তন এনেছে। ফোগেলের পদ্ধতিতে অর্থনীতির মূল্যায়নের এটাই মূল প্রশ্ন।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের মানুষের গড় উচ্চতা খুব সামান্যই বেড়েছে। নারীর ক্ষেত্রে বৈশ্বিক উচ্চতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯৮তম। আর পুরুষের ক্ষেত্রে এ অবস্থান ১৮৫তম। এটি ২০১৬ সালের গবেষণা। ১০ বছরে এসেও খুব বেশি পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি। ২০০টি দেশের ওপর পরিচালিত এক জরিপ শেষে ‘ই-লাইফ’ নামের বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকীতে এ তথ্য জানানো হয়। ১৮৯৬ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মানুষের উচ্চতা পরিবর্তনের হার সম্পর্কে এ তথ্য জানানো হয়।
সূচকে দেখা গেছে, গত ১০০ বছরে বাংলাদেশে নারীর উচ্চতা বেড়েছে খুব সামান্যই। ১৮৯৬ সাল থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নারীর উচ্চতা বেড়েছে ৫ দশমিক ২ সেন্টিমিটার। অপরদিকে একই সময়ে পুরুষের উচ্চতা বেড়েছে ৯ দশমিক ৩ সেন্টিমিটার। উচ্চতার তারতম্যের ক্ষেত্রে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, পয়োব্যবস্থা ও পুষ্টি হচ্ছে মুখ্য উপাদান। এ ছাড়া মায়ের স্বাস্থ্য ও গর্ভকালীন পুষ্টির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
পুষ্টি-পুঁজির ঘাটতি: অর্থনীতির অদেখা সংকট
ফোগেল ‘থার্মোডাইনামিক হিস্ট্রি’ বা ‘টেকনোফিজিও ইভোলিউশন’ নামে একটি ধারণা দিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, মানব শরীরের কাজ করার ক্ষমতা নির্ভর করে দেহে পর্যাপ্ত ক্যালরি ও পুষ্টিমান জোগানের ওপর। যখন কোনো দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী অপুষ্টিতে ভোগে, তখন তাদের উৎপাদনশীলতা কাঠামোগতভাবে কমে যায়।
বাংলাদেশে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৩১ শতাংশ এখনো খর্বকায়। ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৩৬ শতাংশ রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। এই তথ্যগুলো আমাদের শুধু মানবিক সংকটের সংকেত দেয় না, ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গতি-প্রকৃতিও বুঝতে সাহায্য করে। একটি অপুষ্ট শিশু যখন বড় হয়ে শ্রমবাজারে আসে; তার জ্ঞানক্ষমতা, শারীরিক কার্যক্ষমতা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা—সবই সুপুষ্ট শিশুর তুলনায় কম। ফোগেলের ভাষায়, এটি ‘নেতিবাচক পুঁজি সঞ্চয়’। এতে উৎপাদনশীলতা কমে যায়। অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- স্বাস্থ্য সেবা
- অর্থনৈতিক উন্নয়ন