নবাব সিরাজদৌলা এবং ঔপনিবেশিক বয়ানের অসারতা
ইংরেজিতে একটি প্রবাদবাক্য আছে, যেটাকে বাংলা করলে অনেকটা এমন দাঁড়ায় : কুকুরকে ফাঁসিতে ঝোলাতে চাইলে আগে দুর্নাম রটাও। সাম্প্রতিক অতীতে লিবিয়ার মোয়াম্মার গাদ্দাফি, ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর আগে এমনটাই করা হয়েছিল। ঠিক একই কাজ করা হয়েছিল নবাব সিরাজদৌলার (১৭৩৩-৩ জুলাই, ১৭৫৭) বিরুদ্ধেও। পলাশীর যুদ্ধ, ইংজের দখলদারত্ব যৌক্তিক করতে এমন কোনো অপবাদ নেই, যা তার ওপর আরোপ করা হয়নি। তবে আধুনিক ইতিহাসচর্চা এই একপক্ষীয় বয়ানকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সিরাজদৌলার চরিত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তার নবাব হওয়ার আগের ও পরের জীবনকে পৃথকভাবে দেখা জরুরি। ১৭৩৩ সালে মির্জা মুহম্মদ সিরাজদৌলা জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের ঠিক পরপরই তার মাতামহ আলীবর্দী খান বিহারের ছোট নবাব বা ডেপুটি গভর্নর পদে উন্নীত হন। এ কারণে আলীবর্দী খান সিরাজকে তার সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করতেন।
‘মুজাফফরনামা’র লেখক করম আলির বিবরণী থেকে জানা যায়, আলীবর্দী খান সিরাজকে এক মুহূর্তের জন্যও কাছছাড়া করতে চাইতেন না। তিনি নিজে সিরাজকে শাসনকাজ এবং সামরিক বিদ্যার শিক্ষা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে অতি প্রশ্রয়ের একটি নেতিবাচক ভূমিকা থাকতেও পারে। নানার অপরিসীম স্নেহ এবং দরবারের চাটুকারদের মিথ্যা স্তবস্তুতি তরুণ সিরাজের চরিত্রকে কিছুটা অসংযত ও খামখেয়ালিও করে তুলতে পারে। এরপর ১৭৪৮ সালে সিরাজের পিতা জৈনুদ্দিন আহমেদ নিহত হলে তাকে বিহারের ছোট নবাব করা হয় (যদিও মূল শাসন জানকীরাম চালাতেন)। অর্থাৎ নবাব আলীবর্দী খান তাকে দক্ষ শাসক হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন। ১৭৫২ সালে আলীবর্দী তাকে আনুষ্ঠানিক উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন এবং ১৭৫৬ সালের এপ্রিলে আলীবর্দীর মৃত্যুর পর ২৩-২৪ বছর বয়সি তরুণ সিরাজ বাংলার মসনদে বসেন।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের নবাবকে চক্রান্ত করে উৎখাত করা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নৈতিকতার পরিপন্থি ছিল। তাই লর্ড ক্লাইভ ও তার সহযোগীদের প্রয়োজন ছিল একটি ‘নৈতিক যৌক্তিকতা’। সিরাজদৌলাকে যদি চরম অত্যাচারী এবং দানবীয় রূপ দেওয়া যায়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে ব্রিটিশদের এ অবৈধ ক্ষমতা দখলকে ‘স্বৈরাচারী শাসন থেকে প্রজাসাধারণের মুক্তি’ হিসাবে যৌক্তিকতা প্রমাণ করা সহজ হতো।
এ উদ্দেশ্য থেকেই ব্রিটিশ কুঠিয়াল লিউক স্ক্রাফটন এবং ইতিহাসবিদ রবার্ট ওর্মে ও আলেকজান্ডার ডাও সিরাজের চরিত্রকে কুৎসিতভাবে উপস্থাপন করেন। তাদের এ মন্তব্য যাচাই-বাছাই ছাড়াই ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। ব্রিটিশদের তৈরি সবচেয়ে বড় ও কুখ্যাত প্রোপাগান্ডা ছিল ‘অন্ধকূপ হত্যা’। ১৭৫৬ সালের জুনে নবাব যখন কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ জয় করেন, তখন কোম্পানির কর্মকর্তা জে. জেড. হোলওয়েল দাবি করেন, নবাবের নির্দেশে ১৪ ফুট বাই ১৮ ফুট একটি ছোট ঘরে ১৪৬ জন ইংরেজকে বন্দি করা হয়, যার মধ্যে দম আটকে ১২৩ জন মারা যান। আধুনিক ইতিহাসবিদরা এ ঘটনাকে পুরোপুরি কাল্পনিক এবং সাজানো গল্প বলে প্রমাণ করেছেন। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার তার ‘অ্যান অ্যাডভান্স হিস্টোরি অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে এবং ঐতিহাসিক ভোলানাথ চন্দ্র গাণিতিক হিসাব ও জায়গার পরিমাপ দিয়ে দেখিয়েছেন, ওই আয়তনের একটি ছোট ঘরে ১৪৬ জন মানুষকে গাদাগাদি করে রাখা শারীরিকভাবেই অসম্ভব। সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, সমসাময়িক কলকাতার ফরাসি গভর্নর জঁ ল কিংবা ওলন্দাজদের কোনো অফিশিয়াল নথিতে এ বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কোনো উল্লেখ নেই।
পলাশী-পরবর্তী যুগে মুর্শিদাবাদের ক্ষমতা যখন মীরজাফর এবং ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা ব্যক্তিগত প্রাণভয়ে অনেক স্থানীয় ইতিহাসবিদ বিজয়ী শক্তির মনের মতো করে ইতিহাস লিখতে বাধ্য হন। ড. সুশীল চৌধুরী তার গবেষণায় এ দরবারি লেখকদের ব্যক্তিগত আক্রোশ ও স্বার্থের দিকটি বিশদভাবে উন্মোচন করেছেন।
সিরাজ চরিত্রের সবচেয়ে কট্টর সমালোচক ছিলেন ‘সিয়ার-উল-মুতাখখিরিনে’র লেখক গোলাম হোসেন খান। তিনি সিরাজের ওপর ‘অজ্ঞ অর্বাচীন যুবক’, ‘হৃদয়হীন’, ‘রূঢ়ভাষী’ ইত্যাদি কড়া বিশেষণ আরোপ করেন। এমনকি তিনি এমন গুরুতর অভিযোগও তোলেন যে, সিরাজ বিখ্যাত ব্যাংকার জগৎশেঠকে জোরপূর্বক খতনা করানোর ভয় দেখিয়েছিলেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ঔপনিবেশিক
- ইতিহাস চর্চা