মেজর মোজাফফরের গ্রেফতার এবং কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন
সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় দণ্ডিত অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর মোজাফফর হোসেনের গ্রেফতার বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়কে আবারও জনআলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। ১৯৮১ সালের মে মাসের সেই ঘটনাবলির চার দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও তা আজও জাতীয় চেতনায় গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ একটি বিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং পুনর্গঠনের বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। স্বাধীনতার পরবর্তী বছরগুলো ছিল অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক মেরুকরণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সংকট, দুর্নীতি এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে চিহ্নিত, যার ফলে জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি আস্থা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় এবং বাকশালের অধীনে একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়। এসব পদক্ষেপকে কেউ রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন, আবার কেউ গণতান্ত্রিক বহুমতের পরিসর সংকুচিত করার পদক্ষেপ হিসাবে মূল্যায়ন করেন। একই বছরের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এবং সামরিক প্রভাবের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে।
এ অস্থির সময়েই জেনারেল জিয়াউর রহমান ধীরে ধীরে জাতীয় নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হন এবং পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার শাসনামলে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা সম্প্রসারণের নীতি অনুসরণ করা হয়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিকাশ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়নের ক্ষেত্রে তার সরকারের অবদান বহু গবেষক স্বীকার করেন। একইসঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর কিছু বিধিনিষেধ এবং শাসনব্যবস্থায় সামরিক প্রভাবের বিষয়েও সমালোচনা বিদ্যমান, যা তার শাসনকালকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
১৯৭৫ সালের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে একাধিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং নেতৃত্বগত টানাপোড়েন সংঘটিত হয়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন পেশাগত ও প্রশাসনিক কারণে বাহিনীর অভ্যন্তরে অসন্তোষ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই ১৯৮১ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সফরে যান। ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে তিনি নিহত হন, যা জাতিকে আবারও এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
ঘটনার পর সরকার দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সে সময়ের চট্টগ্রাম গ্যারিসনের প্রধান কর্মকর্তা মেজর জেনারেল আবুল মনজুরকে আটক করা হয় এবং পরে তিনি বিতর্কিত পরিস্থিতিতে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর একাধিক সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর দেশের সর্বোচ্চ আদালত দণ্ডাদেশ বহাল রাখেন। কয়েকজন দণ্ডিত কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, অন্যদিকে কিছু অভিযুক্ত দীর্ঘদিন পলাতক অবস্থায় ছিলেন। মেজর মোজাফফর হোসেনের সাম্প্রতিক গ্রেফতার সেই বিচারিক রায় কার্যকরের ধারাবাহিকতারই একটি অংশ।
যদিও বিচারিক প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়েছে, তবুও ইতিহাসবিদদের গবেষণা ও বিশ্লেষণ অব্যাহত রয়েছে। আদালতের কাজ আইনগত দায় নির্ধারণ করা, কিন্তু ইতিহাসের গবেষণা রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে বৃহত্তর পরিসরে মূল্যায়ন করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী প্রথম দশক রাষ্ট্রগঠন, বেসামরিক কর্তৃত্ব সুসংহত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার কঠিন বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। তাই নিম্নলিখিত অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্যে উচ্চপদস্থ সামরিক, বেসামরিক কর্মকর্তা এবং সুপ্রিমকোর্টের একজন প্রখ্যাত ও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি তৈরি করা একান্ত অপরিহার্য।