মরিয়ম মরিয়া প্রমাণ করিল, কিছু প্রশ্ন ফিরে ফিরে আসে
সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় স্ত্রীসহ রিমান্ডে যাওয়ার ঘটনা বিরল এবং অস্বাভাবিক। যদিও ২০১৩ সালের সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় সাংবাদিক পেটানোর মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তৎকালীন সরকারদলীয় এমপি গোলাম মাওলা রনি। কিন্তু সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় সস্ত্রীক রিমান্ডে যাওয়ার ঘটনা জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত এমপি গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রেই প্রথম ঘটল। কোনো রাজনৈতিক মামলায় নয়, তিনি গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ডে গেছেন দ্বিতীয় স্ত্রীকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়ার মামলায়। যে মামলার আসামি তার প্রথম স্ত্রীও।
গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ‘আত্মহত্যা’র ঘটনায় বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে।
১. নৈতিক স্খলনের সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলায় দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরেও গাজী নজরুল কীভাবে সংসদ সদস্য পদে বহাল রয়েছেন?
২. ইসলাম একাধিক বিয়েকে বৈধতা দিলেও সেটি কি সবার জন্য?
৩. একাধিক বিয়ে বৈধ হলেও এক ঘরে দুই স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস কি নৈতিকতার বিবেচনায় সমর্থনযোগ্য?
৪. মৃত্যুর পরে মরিয়মের হাতে লেখা কিছু চিরকুট সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে, যেখানে তার রাগ-ক্ষোভ-অভিমানের কথা ফুটে উঠেছে। যেগুলোকে অনেকটা সুইসাইড নোট বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু মরিয়মের মা বলছেন, চিরকুটের হাতের লেখা তার মেয়ে মরিয়মের নয়। যদি তাই হয়, তাহলে এগুলো কে লিখেছেন? কেন লিখেছেন? এই ঘটনাটি কি তাহলে আত্মহত্যা নয়? অবশ্য গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের বিতর্কিত ভিডিও ফাঁসের পর থেকে ওর মা-বাবার আচরণ ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
৫. মরিয়মের মতো একজন টিনেজ মেয়ে কোন বাস্তবতায় তার বাবার বয়সী একজন পুরুষকে বিয়ে করেছিলেন বা করতে বাধ্য হয়েছিলেন? তিনি কি শেষ পর্যন্ত একজন ক্ষমতার বলি হলেন?
মরিয়মের মৃত্যু নীতি-নৈতিকতা নিয়ে এমন একগুচ্ছ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সমাজকে, যা ফিরে ফিরে আসে। মরিয়ম মরিয়া প্রমাণ করিল, সেই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
প্রসঙ্গত, গত জুলাই মাসে একজন তরুণীর সঙ্গে সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের জামায়াত এমপি গাজী নজরুল ইসলামের একাধিক ভিডিও নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ঘটনার পর এই ভিডিওকে ভুয়া বা বানানো বলে দাবি করলেও পরবর্তীতে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াত। ঘটনার পরে বলা হয়, মরিয়ম নামে ওই তরুণী এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে যার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। যেহেতু একজন সংসদ সদস্যকে চাইলেই গ্রেপ্তার করা যায় না, ফলে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে তাকে সস্ত্রীক গ্রেপ্তার করে পুলিশ এবং আদালতে নিয়ে রিমান্ড আবেদন করলে আদালত নজরুল ইসলামের চারদিন এবং তার প্রথম স্ত্রীর একদিন রিমান্ড মঞ্জুর করে।
চিরকুট রহস্য
মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের সময় বেশ কয়েকটি চিরকুট উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। যার একটিতে লেখা আছে, “শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই…তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…।” আরেকটিতে লেখা, “আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবইবা কেমনে, যুদ্ধের শেষ প্রান্তে যেয়ে দেখি তুমিতো ছিলে বিপক্ষের সেনাপতি। আমি হেরেছি তুমি জিতেছো, কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি ধ্বংসের শেষ দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি। ভেবে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।”
আরেকটি চিরকুটে আছে দুটি লেখা। একটিতে আছে, “সে ছিলো অন্য নারীর স্বামী। কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ এর…!!! আর আমি ছিলাম বোকা…!!! অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!!”
যদি এই চিরকুটগুলো সত্যিই মরিয়মের লেখা হয়ে থাকে তাহলে এটা স্পষ্ট যে, এই চিরকুটগুলো তিনি তার স্বামী গাজী নজরুল ইসলামকে উদ্দেশ করেই লিখেছেন—যেখানে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ ও অভিমান ফুটিয়ে তুলেছেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- আত্মহত্যা
- রিমান্ড
- সংসদ সদস্য