দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য নিরাপত্তায় সমন্বিত উদ্যোগ যখন সময়ের দাবি
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম জনবহুল অঞ্চল। এই অঞ্চলের প্রায় দুই বিলিয়নেরও বেশি মানুষের খাদ্য, পুষ্টি ও জীবিকার সঙ্গে কৃষি সরাসরি সম্পর্কিত। অথচ জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি হ্রাস, মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া, পানির সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা এবং বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা, সব মিলিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা আজ একটি জটিল আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তা বলতে কেবল খাদ্যের প্রাপ্যতাই বোঝায় না; বরং নিরাপদ, পুষ্টিকর, সাশ্রয়ী ও মানসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিত করা এর মূল উদ্দেশ্য। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং সঠিক কৃষি ব্যবস্থাপনার অভাবে খাদ্যের নিরাপত্তা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
এ অবস্থায় উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ করা এখন আর বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য। জমি প্রস্তুতকরণ, মানসম্মত বীজ নির্বাচন, সুষম সার প্রয়োগ, নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবস্থাপনা, সেচ, ফসল সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ, প্রতিটি ধাপে বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা অনুসরণ করলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারেও দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘ খরা, আকস্মিক বন্যা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা কৃষি উৎপাদনকে অনিশ্চিত করে তুলছে। ফলে জলবায়ু সহনশীল উন্নত জাত উদ্ভাবন, গবেষণা এবং দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তি বিনিময় এখন অত্যন্ত জরুরি। একটি দেশে উদ্ভাবিত সফল প্রযুক্তি বা জাত দ্রুত অন্য দেশে সম্প্রসারণ করা গেলে পুরো অঞ্চলের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাই অধিক স্থিতিশীল হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার কৃষির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো মাটির স্বাস্থ্য। বছরের পর বছর অনিয়ন্ত্রিত সার ব্যবহারের ফলে অনেক অঞ্চলের মাটিতে জৈব পদার্থ কমে যাচ্ছে, পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। তাই নিয়মিত মাটি পরীক্ষা, মাটির স্বাস্থ্যভিত্তিক সার সুপারিশ, জৈব সার ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। মাটির প্রকৃত অবস্থা জেনে সার প্রয়োগ করলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, ফলন বাড়বে এবং পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।
একইভাবে পানি ব্যবস্থাপনাও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান উপাদান। দক্ষিণ এশিয়ার বহু এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। অন্যদিকে কোথাও আবার অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই আধুনিক সেচ প্রযুক্তি, পানি সাশ্রয়ী কৃষি ব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং দক্ষ পানি ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা সহজ হবে।
নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের অন্যতম দাবি। অনেক ক্ষেত্রেই কৃষক প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা অনুমোদনহীন কীটনাশক ব্যবহার করেন। ফলে খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ থেকে যায়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, জৈব ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে বড় অগ্রগতি অর্জন সম্ভব।
খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ান ভ্যালু চেইন শক্তিশালী করাও অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে উৎপাদন ও ভোক্তার মধ্যে দীর্ঘ বিপণন ব্যবস্থার কারণে কৃষক ন্যায্য মূল্য পান না, আবার ভোক্তাকেও বেশি দাম দিতে হয়। আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, কোল্ড চেইন, মানসম্মত প্যাকেজিং, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি, ই-কমার্স এবং সীমান্ত বাণিজ্য সহজ করা গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে।