যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য মাত্র ৩৫ বছরেই কেন শেষ
বিশ শতকে সর্বজয়ী ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দেশটি শুধু প্রতিদ্বন্দ্বীহীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিই হয়ে ওঠেনি, বরং সাংবিধানিক সরকার ও মুক্তির গ্রহণযোগ্য মূল্যবোধও সঞ্চার করেছে। তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
কেনই–বা যুক্তরাষ্ট্র এ রকম গ্রহণযোগ্য হয়েছিল, আর কীভাবে ব্যর্থ হলো, তা বুঝতে হলে অন্তত ১৯ শতকে ফিরে যেতে হবে।
এই শতকের মধ্যভাগে ইউরোপীয় শক্তিগুলো বিশেষ করে যুক্তরাজ্য বিশাল সাম্রাজ্য ও বাষ্পীয় শক্তির অধিকারী হয়ে দুনিয়া শাসন করত।
এরপর ১৯১৪ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের কালে নেতৃত্বস্থানে উঠে এল যুক্তরাষ্ট্র—রসায়ন, বিদ্যুৎ, দূরালাপন, ওষুধ, জ্বালানি, বেতার ও উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটিয়ে। ফলে বড় ধরনের পরিবর্তন সূচিত হলো, যা শুধু বিশ্বায়নেই থেমে থাকল না।
শক্তির ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসা শুরু হলো। ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটল সাম্রাজ্যবাদী জার্মানির উত্থানে।
অন্যদিকে এশিয়ায় উত্থান ঘটল জাপানের। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান, যখন সে ১৯১৪ সালে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হলো।
ইউরোপে আধিপত্য বিস্তারের জন্য উদীয়মান শক্তি জার্মানির সঙ্গে তিন শক্তি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার যে লড়াই শুরু হয়েছিল, সেটা মূল বিষয় ছিল না, যেমনটা তারা ভেবেছিল। মূল বিষয়টা ছিল যুক্তরাষ্ট্র কখন প্রধান শক্তিতে পরিণত হবে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠল ইউরোপের প্রভু। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশটি শান্তিপ্রক্রিয়াকে সমর্থন দিয়ে সেখান থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলে শান্তিই অপ্রয়োগযোগ্য হয়ে গেল।
নিজেকে প্রত্যাহারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংকট, ১৯২০ শতকের মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব সহযোগে মহামন্দা ধাবিত করল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে।
তবে এ সময়টা ভিন্ন। ১৯ শতকের আদর্শিক সংঘাত ও রুশ সাম্রাজ্যের ধ্বংসের ফল হিসেবে আবির্ভূত হওয়া সোভিয়েত কমিউনিজমের সঙ্গে প্রতিযোগিতার প্রেরণায় যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে সম্পৃক্ত থেকে গেল।
ফলে শুরু হলো ঠান্ডা যুদ্ধ। এই বিরোধে ইউরোপ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেল: পশ্চিমাংশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠল, ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো হারিয়ে গেল এবং একটি সমাজে গণতান্ত্রিক (সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক) ঐক্যের উত্থান ঘটল।
অবাধ মুক্তবাজার হারিয়ে গেল, নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ জায়গা করে নিল। ১৯৮০-এর দশকের ‘নয়া উদারতাবাদের’ বিপ্লব ঘটার পরও ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত রয়ে গেল, কিছুটা পরিবর্তিত রূপে।
১৯৮৯ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও এর সাম্রাজ্য ধসে পড়লে ফ্যাসিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মতো একচ্ছত্রবাদী আদর্শসমূহ এবং জার্মানি, জাপান, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সব ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর ওপর নিজেদের জয়ধ্বনি ঘোষণা করল যুক্তরাষ্ট্র।
এক মেরুর বিশ্ব সূচিত হলো। তবে ইতিহাস তখন হেসেছিল। এই জয়ধ্বনির মাত্র ৩৫ বছরের মধ্যে স্থিতিশীলতার জন্য আধিপত্যকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা উধাও হয়ে গেল, যেমনটা হয়েছিল যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে ১৯০০ সালের মধ্যে।
অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও রাজনীতির একই সঙ্গে পরিবর্তন নিয়ম-শৃঙ্খলাকে বিশৃঙ্খলায় এবং বিজয়কে পরাজয়ে রূপান্তর শুরু করল। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় হলো: চীনের উত্থান, ডিজিটাল বিপ্লব ও দক্ষিণপন্থী জনতুষ্টিবাদের জয়জয়কার।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সাম্রাজ্যবাদী
- একচ্ছত্র আধিপত্য