ঐতিহ্যের অমৃত সাগর কলার রপ্তানি-সম্ভাবনা

www.ajkerpatrika.com শাইখ সিরাজ প্রকাশিত: ৩০ জুন ২০২৬, ০৯:০৩

বাংলাদেশের উর্বর পলিমাটি, নদ-নদীর পলল ও অনুকূল আবহাওয়া যুগ যুগ ধরে কৃষককে নানাবিধ ফসল ফলাতে সাহায্য করছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষির আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং প্রতিটি অঞ্চলের রয়েছে নিজস্ব কিছু ঐতিহ্যবাহী ফল-ফসল। যেমন নরসিংদী জেলার কথা উঠলে একটি বিশেষ চিত্র আমাদের চোখের সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ভেসে ওঠে। নরসিংদী জেলা কেবল প্রাচীন উয়ারী-বটেশ্বরের সমৃদ্ধ ইতিহাস বা তাঁতশিল্পের নিপুণ বুননের জন্যই বিখ্যাত নয়, এই জেলার বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে কৃষির অনন্য সব নিদর্শন। আর সেই নিদর্শনের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও সুপরিচিত নাম হলো অমৃত সাগর কলা। নরসিংদী জেলার বিভিন্ন উপজেলা যেমন শিবপুর, মনোহরদী, বেলাব, পলাশ ও রায়পুরা এলাকার মাটি অমৃত সাগর কলার জন্য এক অভাবনীয় এবং প্রাকৃতিক আশীর্বাদপুষ্ট। এই উপজেলাগুলোর লালচে রঙের দো-আঁশ মাটি এবং এখানকার নিজস্ব আর্দ্র আবহাওয়া অমৃত সাগর কলা উৎপাদনের জন্য প্রকৃষ্ট কারণ। এ কলার অনন্য স্বাদ, মিষ্টি রস এবং সুগন্ধ তৈরি করে, তা বাংলাদেশের অন্য কোনো অঞ্চলে হুবহু পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। কৃষির বৈজ্ঞানিক পরিভাষায়, কোনো নির্দিষ্ট এলাকার মাটি, জলবায়ু ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের এই যে সামগ্রিক প্রভাব, তাকে বলা হয় টেরোয়ার। নরসিংদীর মাটির এই নিজস্ব টেরোয়ার বা বৈশিষ্ট্যের কারণেই অমৃত সাগর কলা এত বেশি সুস্বাদু।


গত মে মাসে নরসিংদীর শিলমান্দি গ্রামে অমৃত সাগর কলার ওপর প্রতিবেদন তৈরির কাজে গিয়েছিলাম। সেখানকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এই কলার সম্ভাবনা নিয়ে যেমন আশাবাদী হয়েছি, কৃষকের বেশ কিছু সংকটের কথাও জেনেছি।


ওই এলাকার কৃষকের কাছে কলাই প্রধান অর্থকরী ফসল। অনেকেই কলা চাষের খরচ কমাতে কলার পাশাপাশি বিভিন্ন সাথি ফসল চাষ করছেন। কলাচাষি মাসুদ জানালেন, সাথি ফসল দিয়ে চাষের খরচটা তুলে ফেলতে পারলে কলা বিক্রির পর যা পাওয়া যায়, তা লাভ হিসেবে থাকে। তবে বর্তমান সময়ে ‘পানামা’ নামের ভাইরাসের আক্রমণ তাঁদের বেশি সমস্যা তৈরি করছে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য কৃষি বিভাগের সহযোগিতা চান তাঁরা।

শিলমান্দি গ্রামের আসাদ ব্যাপারী কলা চাষের পাশাপাশি ঢাকার উত্তরার বাজারে কলা সাপ্লাইও করেন। তিনি কোনো রকম রাসায়নিক ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে কলা পাকান। তাঁর বাড়ি গিয়ে কলা পাকানোর পদ্ধতি সম্পর্কে জানলাম।


বর্তমান বিশ্ববাজারে জি নাইন বা ক্যাভেন্ডিশ নামের একপ্রকার কলার ব্যাপক রাজত্ব এবং আধিপত্য দেখা যায়। ইউরোপ থেকে শুরু করে আমেরিকার প্রায় প্রতিটি সুপার মার্কেটে এই কলার দেখা মেলে। এর পেছনে বেশ কিছু যৌক্তিক এবং ব্যবসায়িক কারণ রয়েছে। জি নাইন কলার শেলফ লাইফ বা সংরক্ষণক্ষমতা অনেক বেশি। এর মানে হলো এই কলা গাছ থেকে কাটার পর অনেক দিন পর্যন্ত সতেজ থাকে এবং সহজে পচে যায় না বা কালচে দাগ পড়ে না। এর পাশাপাশি জি নাইন কলার আকার বেশ সুষম হয় এবং এগুলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে জাহাজে করে পরিবহন করা অত্যন্ত সহজ। কিন্তু স্বাদের দিক থেকে নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে নরসিংদীর অমৃত সাগর কলা জি নাইন বা বিশ্বের যেকোনো আন্তর্জাতিক জাতের কলার চেয়ে অনেক বেশি উন্নত এবং শ্রেষ্ঠ। স্বাদে ও গুণে এত এগিয়ে থাকার পরও আমাদের দেশের অমৃত সাগর কলা বিশ্ববাজারে অনেকটাই পিছিয়ে আছে। এর প্রধান কারণ, আমাদের অত্যন্ত দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন। আমাদের দেশের কৃষকেরা ফসল উৎপাদনে অত্যন্ত দক্ষ ও পরিশ্রমী হলেও বিপণন এবং ফসল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আমরা এখনো অনেক পুরোনো বা সেকেলে পদ্ধতির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। জি নাইন কলা যেভাবে বিশ্বব্যাপী বাজার দখল করেছে, তার মূল রহস্য হলো আধুনিক ও নিরাপদ প্যাকেজিং ব্যবস্থা, রাইপেনিং চেম্বার বা নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কলা পাকানোর ঘর এবং কোল্ড চেইন ম্যানেজমেন্টের সঠিক ব্যবহার। নরসিংদীর অমৃত সাগর কলাকে যদি আমরা বৈশ্বিক মানচিত্রে একটি সম্মানজনক স্থানে নিয়ে যেতে চাই, তবে আমাদের কেবল ফলন বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিলে চলবে না। এর পাশাপাশি আমাদের অবশ্যই পোস্ট হারভেস্ট বা ফসল তোলার পরের আধুনিক প্রযুক্তিগুলোর দিকে অত্যন্ত গভীরভাবে নজর দিতে হবে।

অমৃত সাগর কলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে অ্যাগ্রো প্রসেসিং বা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশের কোনো বিকল্প নেই।


কলার ভ্যালু অ্যাডিশন বা মূল্য সংযোজন করার মাধ্যমে আমরা এই খাতের চেহারা পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারি। প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে কাঁচা এবং পাকা কলা থেকে অত্যন্ত সুস্বাদু চিপস তৈরি করা সম্ভব, যার চাহিদা দেশের বাজার ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও ব্যাপক। তা ছাড়া শিশুদের জন্য অত্যন্ত পুষ্টিকর বেবি ফুড, বেকারি ও কনফেকশনারি শিল্পের জন্য কলার পাউডার এবং সুস্বাদু ফ্রুট জুস তৈরির ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প অনায়াসেই দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে করে যে কলাগুলো আকারে ছোট, একটু বেশি পেকে যায় বা বাজারে সরাসরি তাজা ফল হিসেবে বিক্রির উপযুক্ত থাকে না, সেগুলোও শিল্পকারখানায় কাঁচামাল হিসেবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে। ফলে কৃষকের আর্থিক ক্ষতি একদম কমে আসবে এবং তাঁরা সারা বছর একটি নিশ্চিত আয়ের পথ খুঁজে পাবেন।


কলার গাছ থেকে ফসল সংগ্রহের পর সাধারণত গাছের কাণ্ড, পাতা, বাকল বা মোচা অপ্রয়োজনীয় আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়। অথচ এই ফেলে দেওয়া অংশগুলো হতে পারে উন্নতমানের ফাইবারের এক বিশাল এবং লাভজনক উৎস। কলাগাছের বাকল আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে অত্যন্ত মজবুত এবং টেকসই ফাইবার বা সুতা তৈরি করা যায়। বর্তমান বিশ্বে পরিবেশদূষণ রোধে যখন প্লাস্টিকের বিকল্প এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা আকাশচুম্বী, তখন এই কলার ফাইবার থেকে তৈরি পরিবেশবান্ধব শপিং ব্যাগ, বিভিন্ন ধরনের নজরকাড়া হস্তশিল্প, কার্পেট এবং কাপড় বোনার সুতা বিদেশে রপ্তানি করার বিশাল সুযোগ আমাদের সামনে প্রস্তুত রয়েছে। অ্যাগ্রো প্রসেসিং শিল্প ব্যাপকভাবে বিকশিত হলে গ্রামীণ জনপদে বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীরা এই প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোতে কাজ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিরাট ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও