তৃণমূল বাঁচানোর লড়াইয়ে মমতা কি এক ‘নিঃসঙ্গ শেরপা’?

বিডি নিউজ ২৪ প্রশান্ত কুমার শীল প্রকাশিত: ২৪ জুন ২০২৬, ১৫:৪০

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি গত তিন দশকে অনেক রাজনৈতিক পালাবদলের সাক্ষী হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হলো সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম ও উত্থান। দলটির প্রতিষ্ঠাতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। একজন লড়াকু সৈনিক হিসেবে ভারতে যেমনটা তার পরিচিতি ছড়িয়েছে, তার চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তিনি দ্যুতি ছড়িয়েছেন সংগ্রামের ইতিহাস দিয়ে।


সর্বভারতীয় দলগুলোর সবচেয়ে প্রাচীন দলগুলোর একটি কংগ্রেস ছেড়ে এসে মমতা ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ গঠন করেন। তবে দলটা কংগ্রেসের ভাঙা দল নয়, স্বতন্ত্র দল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এর নামের শেষে যে কংগ্রেস শব্দটি আছে সেটাই লোকে ভুলতে বসেছিল। তবে দলটা যতটা তৃণমূল নামে পরিচিতি লাভ করেছিল, এর চেয়ে বেশি পরিচিতি লাভ করেছে ‘মমতার তৃণমূল’ হিসেবে। একসময় কংগ্রেস ছেড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বেরিয়ে আসার পর গঠিত দলটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছিল। সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পরও দেখা গেছে আসনের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে থাকা দলটির প্রাপ্ত ভোট বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করা বিজেপির চেয়ে নেহায়েত কম নয়।


বিজেপি ২০৮ আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে এবং ভোট পেয়েছে ৪৬ শতাংশ। তৃণমূল পেয়েছে ৮০টি আসন এবং ৪১ শতাংশ ভোট। ৮০ আসন নিয়ে বিধানসভায় বিরোধীদল হিসেবে তৃণমূলের পক্ষে কে কর্তৃত্ব করবেন ওই লড়াইয়ে শুরু হয় ভাঙন। মাত্র কিছু দিনের মধ্যে পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, সবার মনে ধারণার সৃষ্টি হয়েছে—তবে কি বিলীন হওয়ার পথে তৃণমূল? উত্তরটা এক লাইনে বলার মতো বাস্তবতা এখনো যদিও তৈরি হয়নি। তবে উত্তর পেতে হয়তো বেশি সময় লাগবে না আর।


ইতিহাসের এক অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি যেন চোখের সামনে ভেসে আসছে। ১৯৯৭ সালে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বহিষ্কারই তার রাজনৈতিক জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তিনি গড়ে তোলেন তৃণমূল কংগ্রেস। দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম ও সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে তিনি বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শক্তিশালী শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেন। কিন্তু প্রায় তিন দশক পরে এসে দেখলেন, যে অস্ত্র একদিন তাকে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল, সেই বহিষ্কার এবং বিদ্রোহের রাজনীতিই আজ তার দলকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে।


রাজনীতির একটি চিরন্তন সত্য হলো—যে দল আন্দোলনের মাধ্যমে জন্ম নেয়, সেই দলের ভেতরেই আন্দোলনের বীজ লুকিয়ে থাকে। তৃণমূল কংগ্রেসও এর ব্যতিক্রম নয়। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে বহিষ্কৃত নেতাদের নেতৃত্বে ‘আসল’ ও ‘নকল’ তৃণমূলের বিতর্ক সামনে আসছে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ঘাসফুল শিবিরের ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসে বেসুরোদের প্রতিক্রিয়া বেশ সক্রিয়ভাবে দেখা যাচ্ছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বিধানসভায় নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দিয়ে ‘আসল’ বিরোধী দলের তকমা ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। এই ঋতব্রত যাকে সিপিআইএম থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, তৃণমূলে আশ্রয় পেয়ে যিনি মমতার তো বটেই, অভিষেকের গুণগানে ছিলেন পঞ্চমুখ। শুরুতে ঋতব্রতপন্থীরা বলেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাদের আদর্শের মূল ধারক। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কায়েমি রাজত্ব ও নেতৃত্ব তারা মানবেন না। অন্যদিকে মমতার অনুসারীরা, যাদের কালীঘাট-কেন্দ্রিক তৃণমূল নেতৃত্ব বলা হচ্ছে, তারা মনে করছেন, দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা মূলত সংগঠনকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন। তাই তারা শুরুতেই ঋতব্রতসহ তার কিছু অনুসারীকে দল থেকে বহিষ্কার করে দেন। পাল্টা নাটকও অবশ্য অনেক দূর গড়িয়েছে। ঋতব্রতরা এখন মমতাকে বাদ দিয়ে দলের নতুন চেয়ারম্যানের নাম ঘোষণা করেছেন। তাদের ঘোষণা অনুযায়ী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন. তৃণমূলের চেয়ারম্যান এখন হাওড়ার মধ্য বিধানসভার বিধায়ক অরূপ রায়। একই সঙ্গে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে মমতার ভাইয়ের ছেলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তার জায়গায় সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়েছে খোদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে।


তৃণমূল কংগ্রেস কি আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন, নাকি কর্পোরেট কাঠামোয় পরিগঠিত সংগঠন? রাজনৈতিক দল এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত আসে ওপর থেকে নিচে। কিন্তু রাজনৈতিক দলে নেতৃত্বের পাশাপাশি মতভিন্নতা, বিতর্ক এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের জায়গা থাকতে হয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে তৃণমূলের ভেতরে সেই গণতান্ত্রিক চর্চা সংকুচিত হয়েছে কি না, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। এটা ঠিক যে, তৃণমূল কংগ্রেসের দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র ক্রমেই ছোট হয়েছে। ফলে তৃণমূলের সঙ্গে অনেক পুরোনো নেতা ও কর্মীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যার মাধ্যমে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ ও বিদ্রোহ এবং এখন সেই বিদ্রোহ মহা সুনামিতে পরিণত হয়েছে।


মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে যে দলের জন্ম ও বেড়ে ওঠা, সে দলকে কেন মমতা বিদ্রোহের মুখ থেকে নিজের আয়ত্তে আনতে পারছেন না? এখানেই সামনে আসছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার অভিষেককে নিজের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু উত্তরাধিকার রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা সবসময় সাংগঠনিক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে লড়াই, ত্যাগ এবং জনসংযোগের মধ্য দিয়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন, সেখানে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তো অভিষেকই হয়েছে সোনার পাথরবাঁটি হাতে। তৃণমূল থেকে বেরিয়ে যাওয়া বিরোধীরা তো বটেই, মমতার নেতৃত্ব মেনে এখনও তৃণমূলে থেকে যাওয়াদের একটি অংশও অভিষেককে নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।


রাজনীতিতে উত্তরাধিকার নতুন কিছু নয়। ভারতের জাতীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই পারিবারিক নেতৃত্বের উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু উত্তরাধিকার তখনই সফল হয়, যখন তা কর্মীদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত গ্রহণযোগ্যতা পায়। শুধু পারিবারিক সম্পর্ক কোনো নেতাকে জননেতা বানাতে পারে না। ইতিহাসে বহু রাজনৈতিক দল উত্তরাধিকার সংকটের কারণে দুর্বল হয়েছে। এশিয়াতে খুঁজলে এর হাজারটা প্রমাণ পাওয়া যাবে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

এই সম্পর্কিত

আরও