আইন নয়, ভালোবাসাই বার্ধক্যের প্রকৃত আশ্রয়

জাগো নিউজ ২৪ রাধেশ্যাম সরকার প্রকাশিত: ২০ জুন ২০২৬, ১১:৪৪

একটি সভ্য সমাজের পরিচয় কেবল তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সুউচ্চ অট্টালিকা কিংবা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় সে সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল ও নির্ভরশীল মানুষদের কতটা মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা দিতে পারে, তার ওপর। শিশু, নারী, প্রতিবন্ধী এবং প্রবীণ—এই চারটি শ্রেণির মানুষের প্রতি রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের আচরণই একটি জাতির মানবিকতার প্রকৃত মানদণ্ড। একটি সমাজ যতই প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হোক না কেন, যদি সেখানে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও মানবিক আচরণ দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ কেবল অবকাঠামো নয়, বরং মানবিক সম্পর্কের দৃঢ়তা ও সামাজিক বন্ধনের গভীরতা।


বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, বার্ধক্যের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থের অভাব নয়, বরং সম্পর্কের অভাব।চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং জীবনমানের পরিবর্তনের ফলে মানুষ আগের তুলনায় দীর্ঘদিন বেঁচে থাকছেন, কিন্তু সেই দীর্ঘ জীবন সব সময় মর্যাদাপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। অনেক প্রবীণ আজ নিঃসঙ্গতা, অবহেলা, মানসিক অবক্ষয় এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন, যা ধীরে ধীরে তাঁদের আত্মমর্যাদা ও মানসিক স্থিতিকেও ক্ষয় করে দেয়।


ই অবস্থার বাস্তবতা প্রতিদিনের সমাজজীবনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কোথাও বৃদ্ধ মা একা বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন, কয়েক দিন পরে প্রতিবেশীরা খবর পান। কোথাও অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা বিছানায় পড়ে থাকেন, অথচ প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের কারও সময় হয় না তাঁর খোঁজ নেওয়ার। আবার কোথাও সন্তানরা দেশের বড় শহরে কিংবা বিদেশে প্রতিষ্ঠিত জীবন গড়েছেন, আর গ্রামের বাড়িতে থাকা মা-বাবা প্রতিদিন অপেক্ষা করছেন একটি ফোনকল বা একটি আন্তরিক খোঁজখবরের জন্য, যা তাঁদের জীবনের একমাত্র প্রত্যাশায় পরিণত হয়েছে। এমনকি অনেক সচ্ছল পরিবারের প্রবীণ সদস্যদেরও বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে হচ্ছে, যা পারিবারিক কাঠামোর ভাঙনের একটি গভীর চিত্র তুলে ধরে। এই বাস্তবতা কেবল পারিবারিক ব্যর্থতা নয়; এটি সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা এবং মানবিক চেতনার ক্রমাবনতির প্রতিচ্ছবি, যা একটি সমাজের অন্তর্নিহিত সংকটকে আরও গভীরভাবে ও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।


এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার প্রবীণদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ২০১৩ সালে পিতামাতা ভরণপোষণ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সন্তানদের ওপর পিতা-মাতার ভরণপোষণের আইনগত দায়িত্ব আরোপ করা হয়। একই বছরে জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩ প্রণীত হয়, যার লক্ষ্য ছিল প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, অংশগ্রহণ, মর্যাদা এবং কল্যাণ নিশ্চিত করা। নিঃসন্দেহে এই দুটি উদ্যোগ মানবিক রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কারণ কোনো পিতা-মাতা যেন সন্তানের অবহেলায় অভুক্ত, অসহায় কিংবা চিকিৎসাবঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বের অংশ।


তবে বাস্তবতা হলো, আইন কার্যকর হওয়ার পরও এই আইনে মামলার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। এর অন্যতম কারণ বাঙালি পারিবারিক সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত আবেগনির্ভর সম্পর্ক। অধিকাংশ পিতা-মাতা সন্তানের অবহেলা বা কষ্ট সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হতে চান না। তাঁরা শাস্তি নয়, সন্তানের পরিবর্তন, অনুশোচনা এবং ভালোবাসার প্রত্যাবর্তন প্রত্যাশা করেন। তাই আইন একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে, কিন্তু ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের উষ্ণতা ফিরিয়ে আনতে পারে না।


প্রকৃতপক্ষে প্রবীণদের বর্তমান সংকটের মূল শিকড় আমাদের দ্রুত পরিবর্তিত সামাজিক কাঠামোর ভেতরে নিহিত। প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, নগরায়ণ, কর্মব্যস্ততা, বিদেশমুখী শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, ছোট পরিবার এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারা পারিবারিক সম্পর্কের প্রকৃতি বদলে দিয়েছে। আজ স্মার্টফোনের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে মুহূর্তেই যোগাযোগ করা যায়, কিন্তু একই বাড়িতে থাকা প্রবীণ মা-বাবার সঙ্গে অনেক সময় দিনের পর দিন অর্থবহ কথোপকথন হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো বন্ধু, অসংখ্য অনুসারী এবং ভার্চুয়াল সম্পর্ক থাকলেও বাস্তব জীবনে সম্পর্কের গভীরতা ক্রমশ ক্ষয় হচ্ছে। আমরা ক্যারিয়ার, উচ্চ আয়, সামাজিক মর্যাদা এবং ভোগবাদী সাফল্যকে জীবনের প্রধান মানদণ্ডে পরিণত করেছি। এই প্রতিযোগিতায় আমরা অনেক কিছু অর্জন করছি, কিন্তু হারিয়ে ফেলছি সম্পর্কের উষ্ণতা, পারিবারিক বন্ধন এবং আবেগের নিরাপদ আশ্রয়। অথচ যে মা রাত জেগে সন্তানের জ্বর দেখেছেন, যে বাবা নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছেন, বার্ধক্যে এসে তাঁদের সবচেয়ে বড় চাওয়া নতুন কোনো সম্পদ নয়; তাঁরা শুধু অনুভব করতে চান যে তাঁরা এখনো পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ, সম্মানিত এবং ভালোবাসার মানুষ, যাঁর উপস্থিতি পরিবারের জন্য এখনো অর্থবহ।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও