বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক শক্তি কি অভিবাসন
বাংলাদেশে এখন এমন একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেটিকে আর পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু তাদের জন্য পর্যাপ্ত কাজ তৈরি হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ থেকে শুরু করে গ্রামের অদক্ষ যুবক-অনেকের কাছেই ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এ বাস্তবতা শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক হতাশা, অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতারও কারণ হয়ে উঠছে। কিন্তু একই সময়ে আরেকটি বাস্তবতাও রয়েছে। বিভিন্ন দেশে শ্রমের চাহিদা বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ-সবখানেই নতুন শ্রমশক্তির প্রয়োজন হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এ সুযোগটিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে পারছে? আমি মনে করি, অভিবাসনকে আমরা এখনো খুব ছোট করে দেখছি। এটিকে আমরা ব্যক্তিগত জীবিকা অর্জনের পথ হিসাবে দেখি, কিন্তু অর্থনীতির কেন্দ্রীয় কৌশল হিসাবে দেখি না। অথচ বাস্তবতা হলো-বাংলাদেশের অর্থনীতি, গ্রামীণ সমাজ এবং বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতার পেছনে অভিবাসনের ভূমিকা এখন এতটাই গভীর যে এটিকে আর প্রান্তিক খাত হিসাবে দেখার সুযোগ নেই।
রেমিট্যান্স : শুধু ডলারের হিসাব নয়
বাংলাদেশে রেমিট্যান্স নিয়ে আলোচনা হলেই আমরা সাধারণত সংখ্যার দিকে তাকাই-কত বিলিয়ন ডলার এলো, কত শতাংশ বাড়ল, রিজার্ভে কী প্রভাব পড়ল। কিন্তু আমি যত বেশি এ বিষয় নিয়ে কাজ করেছি, তত বেশি বুঝেছি যে রেমিট্যান্সকে শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা যায় না। একজন প্রবাসী শ্রমিক যখন মাস শেষে পরিবারে টাকা পাঠান, তখন তিনি শুধু অর্থ পাঠান না। তিনি দূরত্ব সত্ত্বেও নিজের পরিবারের অংশ হয়ে থাকার চেষ্টা করেন। তিনি তার দায়িত্ব পালন করেন, নিজের সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখেন এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজের পরিচয়কেও ধরে রাখেন। এ কারণেই আমি মনে করি, রেমিট্যান্সকে ‘অর্থের প্রবাহ’ হিসাবে নয়, বরং ‘সম্পর্কের অর্থনীতি’ হিসাবে বোঝা জরুরি। কারণ এ সম্পর্ক যতদিন থাকবে, রেমিট্যান্সও ততদিন থাকবে।
সাফল্যের আড়ালে যে দুর্বলতা
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় শ্রম রপ্তানিকারক দেশ-এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। কিন্তু এ সাফল্যের ভেতরে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতাও রয়েছে, যেগুলো নিয়ে আমরা খুব কম কথা বলি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো-আমরা এখনো মূলত নিম্ন দক্ষতার শ্রমিক পাঠাই। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা কম থাকে, আয় সীমিত থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে হয়। অন্যদিকে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম বা কয়েকটি পূর্ব এশীয় দেশ পরিকল্পিতভাবে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করে পাঠিয়ে অনেক বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করছে। এর সঙ্গে রয়েছে আরেকটি ঝুঁকি-অতিরিক্ত নির্ভরতা। বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। কিন্তু বৈশ্বিক রাজনীতি, যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন কিংবা শ্রমনীতি বদলে গেলে এ নির্ভরতা খুব সহজেই সংকটে পরিণত হতে পারে। সাম্প্রতিক বিশ্ব বাস্তবতা সেটিই আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে।
অভিবাসনকে এখনো আমরা ‘নীতি’ বানাতে পারিনি
বাংলাদেশে অভিবাসনকে এখনো অনেকাংশে ব্যক্তিগত উদ্যোগের বিষয় হিসাবে দেখা হয়। পরিবার টাকা জোগাড় করবে, এজেন্ট খুঁজবে, মানুষ বিদেশে যাবে-রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে শুধু অনুমোদনদাতার ভূমিকায় থাকে। কিন্তু সফল শ্রম রপ্তানিকারক দেশগুলো ভিন্নভাবে কাজ করে। তারা বৈশ্বিক শ্রমবাজার বিশ্লেষণ করে, কোথায় কী ধরনের শ্রমের চাহিদা বাড়ছে তা পর্যবেক্ষণ করে, সেই অনুযায়ী দক্ষতা তৈরি করে এবং কূটনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। অর্থাৎ, তাদের কাছে অভিবাসন শুধু শ্রম পাঠানো নয়; এটি একটি রাষ্ট্র-পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কৌশল। বাংলাদেশ এখনো সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। ফলে আমরা অনেক সময় সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হই। শুধু কতজন যাচ্ছে, সেটাই আসল প্রশ্ন নয়। আমাদের নীতিনির্ধারণে এখনো একটি প্রবণতা খুব স্পষ্ট-কতজন বিদেশে গেল, সেটিকেই সাফল্যের মাপকাঠি হিসাবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-কোথায় যাচ্ছে, কী ধরনের কাজে যাচ্ছে এবং কী শর্তে যাচ্ছে?
আমরা গবেষণায় দেখেছি, যেসব দেশে অভিবাসন অস্থায়ী এবং পরিবার নিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত, সেসব দেশে কর্মরত শ্রমিকরা তাদের আয়ের বড় অংশ দেশে পাঠায়। অন্যদিকে স্থায়ী অভিবাসনের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে রেমিট্যান্স কমে আসতে পারে, কারণ পরিবারও বিদেশে চলে যায় এবং অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার কেন্দ্র বদলে যায়। তাই বাংলাদেশের অভিবাসন নীতিকে আরও কৌশলগত হতে হবে। শুধু শ্রমিক পাঠানো নয়, সঠিক দেশে, সঠিক কাজের জন্য, সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে মানুষ পাঠানোই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
দক্ষতা : সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের জায়গা
বাংলাদেশের অভিবাসন নীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখনো দক্ষতার ঘাটতি। দক্ষ শ্রমিক মানেই বেশি আয়-এটি খুব সাধারণ একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু আমাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে সাধারণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। জাপানে যেতে হলে ভাষা জানতে হয়, ইউরোপে যেতে হলে নির্দিষ্ট কারিগরি দক্ষতা লাগে, মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে গেলেও এখন আগের চেয়ে বেশি বিশেষায়িত দক্ষতা দরকার। কিন্তু আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে ‘বিদেশে পাঠানোর’ জন্য প্রস্তুত করি, ‘আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার’ জন্য নয়। এ জায়গাটিই বদলাতে হবে।
দালালতন্ত্র : শুধু সমস্যা বললে বাস্তবতা বোঝা যায় না
অভিবাসন নিয়ে আলোচনা হলেই ‘দালাল’ শব্দটি সামনে আসে। এবং বেশির ভাগ সময় সেটি প্রতারণা, শোষণ বা অনিয়মের প্রতীক হিসাবেই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। আমার গবেষণায় দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীরাই তথ্য দেয়, যোগাযোগ তৈরি করে এবং এমন একটি জটিল প্রক্রিয়াকে সহজ করে, যেটি রাষ্ট্র কার্যকরভাবে করতে পারেনি। এটি অবশ্যই শোষণকে বৈধতা দেওয়ার যুক্তি নয়। বরং এখান থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায় তা হলো-পুরো ব্যবস্থাটিকে আরও স্বচ্ছ, নিয়ন্ত্রিত এবং জবাবদিহিমূলক করতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের পুরোপুরি বাদ দেওয়ার চেয়ে তাদের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসাই সম্ভবত বেশি কার্যকর পথ।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বৈদেশিক শ্রমবাজার