আচারে-বিচারে ঈদ আসে

ঢাকা পোষ্ট আফসানা বেগম প্রকাশিত: ২৭ মে ২০২৬, ১৪:২৬

বাঙালির জীবনে উৎসবের শেষ নেই। অন্যদিকে, বাঙালি উৎসবপ্রিয় জাতিও বটে। সামান্য আনন্দ-উৎসবের সম্ভাবনা দেখলে সেখানে দল বেধে ঝাঁপিয়ে পড়া বাঙালির পুরোনো অভ্যাস। আর কিছু কিছু উৎসব তো একেবারে অবধারিত, যেমন কোরবানির ঈদ।


বছর বছর ঈদ আসে ধর্মীয় উৎসবের মোড়কে। কিন্তু ঈদ কি কেবল ধর্মীয় উৎসব? সেরকম হলে ঈদে কেবল ইবাদত হতো, কোরবানি হতো, হতো না কোলাকুলিও। আমরা যেমনটা শুনে আসছি, ‘বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের মধ্যে দিয়ে ঈদুল আজহা পালিত হলো’—সত্যিই কি ঈদ উৎসবে আছে কেবলই ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য? বরং ঈদ উৎসবে আছে নানান আচার-অনুষ্ঠান। এই আচারগুলো ছাড়া পালনকারীর কাছে ঈদ হয়ে যাবে পানসে।


কোরবানি ঈদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পশু কোরবানি দেওয়া। ধর্মীয় কাহিনি থেকে মানুষ ত্যাগের যে প্রতিচ্ছবি পায়, সেই ত্যাগই নিজের জীবনে চর্চা করতে চায়। বলাবাহুল্য ধার্মিক থাকতে হলে তাকে তা করতে হয়। বাংলাদেশে মানুষ তাই পশু কোরবানির বিষয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। প্রতি বছর কোরবানির ঈদে পশু কোরবানি এখানকার রেওয়াজ।


অদ্ভুত বিষয় হলেও সত্য যে, এই তো এশিয়ারই আরেক মুসলিম দেশ মালয়েশিয়া, যেখানে মানুষ মনে করে ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে তার সম্পূর্ণ জীবনে মাত্র একবার কোরবানি অবশ্যপালনীয় করা হয়েছে। কেউ যদি বারবার তা করতে চান তবে তিনি তা করতেই পারেন, কিন্তু অবশ্যপালনীয় মাত্র একবার। অথচ বাংলাদেশিসহ আরও বহু দেশের মুসলিমদের বিশ্বাস কোরবানি প্রতি বছরই করতে হবে। এর মাধ্যমে মানুষ যেমন আত্মত্যাগের চরম মহিমায় পৌঁছে যান, তেমনি তার মনের ক্ষোভ-দুঃখ-লালসা থেকে মুক্ত হন। সোজা কথায় যাকে বলে, মনের পশুকে কোরবানি দেওয়া।


মানুষ কোরবানির মাধ্যমে লোভ-লালসা-হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হয় কি না সেটা বিচার্য বিষয়, তবে মানুষ যে কোরবানিকে একটা প্রতিযোগিতামূলক আচারে পরিণত করেছে সেটা চোখের সামনে দৃশ্যমান। কোরবানির ঢের আগে থেকে শুরু হয় গরুসহ অন্যান্য কোরবানির যোগ্য পশুর আমদানি ও বেচাকেনা। সবচেয়ে বড় গরু কেনা এখন আচার। সংখ্যায় কে কতগুলো গরু কোরবানি দিলো, এই নিয়ে জোর আলোচনাও এখন আচার। আর হাল আমলে শুরু হয়েছে গরু-ছাগল ছাড়াও, ভেড়া, উট ইত্যাদি কোরবানি। এই গ্রাহকেরা সমাজের সবচেয়ে উচ্চস্তরে অবস্থান করেন।


ধর্মীয় দিক দিয়ে কোরবানির মাংস গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু কোরবানি ঈদ এলেই বড় বড় ফ্রিজের ব্যবসা বেড়ে যায়। এই উপলক্ষে নিত্যনতুন ফ্রিজের নকশার আবির্ভাব ও ফ্রিজ কিনলে নানান লাভালাভের কথা কোম্পানিরা জানান। মানুষ যদি মাংস বিলিয়েই দেবে, তাহলে এত এত ফ্রিজ প্রয়োজন পড়ে কেন? যা হোক, কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে নতুন ও আরও বড় ফ্রিজ কেনার আচার এখন স্বাভাবিক বিষয়।


একসময় এই ঈদকে বলা হতো বকরি ঈদ। কারণ এতে মধ্যবিত্ত মূলত বকরি কোরবানি দিত। রোজার ঈদ বা ঈদুল ফিতরে মানুষ যেমন নতুন পোশাক কেনে, কোরবানির ঈদে সেটা কিনত না। প্রকৃতপক্ষে স্বল্প আয়ে আর পোশাক শিল্পের উত্তরণের আগে মানুষের হাতে কোরবানির পশু কেনার পরে আর অন্য কিছুর জন্য টাকা থাকত না। কিন্তু এখন দেখা যায় কোরবানি ঈদেও বাজারে কাপড়চোপড়ের রমরমা ব্যবসা। তাই কোরবানির ঈদে নতুন পোশাক নতুন আচারই বটে।   


এখন আরেক আচার হয়েছে কোরবানি ঈদকে ঘিরে, তা হলো, পশু কেনাবেচা আর কোরবানির সময় আসন্ন হলেই পশু কোরবানির বিরুদ্ধে এক দল মানুষ খেপে যায়। তারা তখন পশুদের প্রতি দরদে সারাদিন পশুহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলতে থাকেন। বলাবহুল্য তাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ সারা বছর জুড়ে মাংস ভক্ষণ করে, কিন্তু চোখের সামনে রক্তারক্তি দেখলে তারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন।


পশুহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক কথা, কিন্তু সারাবছর লাখ লাখ পশু যে হত্যা হয়েই চলেছে এবং মুসলিম হিসেবে আমরা যে নিরামিষভেজি আচারে অভ্যস্ত নই, তা ওইসময়ে অনেকেই ভুলে যান। তাদের দুঃখকে দ্বিগুণ করে তুলতে তখন ফটোশপে রাস্তায় রক্তের বন্যা বয়ে যাওয়ার ছবি দেখতে পাওয়া যায়। তাই দেখে তাদের হতাশার সীমা থাকে না, আবার ঈদের মাংস ভক্ষণও থামে না।


তবে, হ্যাঁ, বাড়ির সামনে সামনে পশু কেটে, চামড়া ছিলে, রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়ে, বাতাসসহ পুরো পরিবেশকে দূষিত করার অধিকার কারও নেই। কিন্তু আচারের চাপে সারা দেশের লোকেরা সেটাই মেনে নিয়েছেন আর করে চলেছেন। ঈদ উপলক্ষে সিটি কর্পোরেশন পশু কাটার সুনির্দিষ্ট জায়গা ও ব্যবস্থা করে থাকে, কিন্তু সেখানে বলতে গেলে কাউকেই গিয়ে কোরবানি দিতে দেখা যায় না। এ-ও কোরবানি ঈদের আচারেরই অংশ।   

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও