চামড়া প্রক্রিয়াকরণে ন্যানো-প্রযুক্তি
বিগত কয়েক বছর ধরে কুরবানির চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেক মানুষ চামড়া রাস্তায় ফেলে দিচ্ছেন কিংবা অযত্নে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও এত কম দামে চামড়া বিক্রি হয়েছে যে, পরিবহণ খরচও উঠেনি। অথচ বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ইতালি, চীন ও তুরস্কে এই চামড়া দিয়ে উন্নতমানের জুতা, ব্যাগ, বেল্ট, জ্যাকেট এবং জুতার সোল তৈরি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও যদি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়, তবে দেশের অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ শ্রমিকের জীবনমানও উন্নত হবে। একসময় দেশের চামড়া শিল্পকে তৈরি পোশাক খাতের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হিসাবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে চামড়া সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকায় চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে এর মূল্য কমে যায়। উন্নত বিশ্বে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
চামড়া পচন থেকে রক্ষা করতে বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিগতভাবে প্রধানত কিউরিং পদ্ধতি বেশি ব্যবহার করা হয়। লবণ প্রয়োগ, আর্দ্রতা হ্রাস বা রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চামড়ার ভেতরের জলীয় অংশ বের করে ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি রোধ করাই এর মূল লক্ষ্য। এগুলো হলো : ১. লবণাক্তকরণ বা সল্টিং : ড্রাই সল্টিং-কাঁচা চামড়ার মাংসের অংশে মোটা দানার লবণ (চামড়ার ওজনের প্রায় ১৫-২০ শতাংশ) ভালোভাবে ঘষে স্তূপ করে রাখা হয়। লবণ চামড়ার ভেতরের পানি টেনে নেয়। ওয়েট সল্টিং-লবণ ও পানির সম্পৃক্ত দ্রবণ তৈরি করে তাতে চামড়া ডুবিয়ে রাখা হয়। ২. শুকানো : সান ড্রাইং-চামড়া টানটান করে খোলা রোদে বা তারে ঝুলিয়ে শুকানো হয়। তবে অতিরিক্ত তাপমাত্রায় চামড়ার ফাইবার বা তন্তু নষ্ট হতে পারে। শেড ড্রাইং-বিজ্ঞানসম্মতভাবে ছায়াযুক্ত ও বাতাস চলাচলের জায়গায় শুকানো সবচেয়ে নিরাপদ। ৩. রেফ্রিজারেশন বা হিমাগার-চামড়া ছাড়ানোর পর তাৎক্ষণিকভাবে বরফ বা হিমাগারের (০-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়) মাধ্যমে ঠান্ডা করে ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার রোধ করা হয়। ৪. ট্যানিং বা পাকা প্রক্রিয়াজাতকরণ : কাঁচা চামড়াকে স্থায়ী এবং ব্যবহারযোগ্য চামড়ায় রূপান্তর করতে ক্রোমিয়াম সালফেট, অ্যালুমিনিয়াম বা উদ্ভিজ উপাদান (যেমন-বাবলা বা হরীতকী গাছের ছাল) ব্যবহার করা হয়। ট্যানিং ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে চামড়ার প্রোটিনকে স্থায়ী করে। ৫. পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও গবেষণা : লবণের ব্যবহার পরিবেশের ক্ষতি করে, তাই বর্তমানে লবণ ছাড়া উদ্ভিজ তেল বা বায়ো-কেমিক্যাল এনজাইম ব্যবহার করে চামড়া সংরক্ষণের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চলছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত ক্ষতিকর রাসায়নিকের বদলে পরিবেশবান্ধব এনজাইম এবং বায়ো-প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কারখানায় রাসায়নিকের ব্যবহার প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। চামড়ার পণ্যে নিজস্ব টেক্সচার ও সূক্ষ্ম নকশা তৈরি করতে থ্রি-ডি প্রিন্টিং এবং লেজার কাটিং প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এটি অপচয় রোধ করে সর্বোচ্চ আউটপুট নিশ্চিত করে। ন্যানো-প্রযুক্তি চামড়ার উপরিভাগে একটি প্রতিরক্ষামূলক আবরণ তৈরি করে, যা চামড়াকে পানি, দাগ এবং তাপ প্রতিরোধক করে তোলে এবং পণ্যের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করে। স্বয়ংক্রিয় সেন্সর ও ইন্টারনেট অব থিংসের মাধ্যমে ট্যানিং ড্রামের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও রাসায়নিকের মাত্রা নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এতে চামড়ার মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্রোম রিকভারি ইউনিট স্থাপন করে বর্জ্য পানি থেকে পুনরায় ক্রোমিয়াম আলাদা করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে পরিবেশ দূষণ যেমন কমছে, তেমনি উৎপাদন খরচও সাশ্রয় হচ্ছে। চামড়া শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করতে যদি দেশেই আন্তর্জাতিক মানের জুতা, ব্যাগ, মানিব্যাগ, বেল্ট, জ্যাকেট ও জুতার সোল তৈরি করা যায়, তাহলে রপ্তানি আয় বহুগুণে বাড়বে। বিশেষ করে জুতার সোল তৈরির ক্ষেত্রে এখনো বিদেশ নির্ভরতা রয়েছে। অথচ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্যের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে উন্নতমানের জুতা ও চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা অনেক বেশি। কিন্তু ব্র্যান্ডিং ও বিপণনের অভাবে বাংলাদেশ সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা, অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশি পণ্যকে বিশ্ববাজারে পরিচিত করতে হবে। একইসঙ্গে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে শক্তিশালী করতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অনেক দেশ এখন পরিবেশবান্ধব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কঠোর নীতি অনুসরণ করছে। তাই বাংলাদেশকে অবশ্যই পরিবেশবান্ধব ট্যানিং প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার কার্যকর করা, রাসায়নিক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি চালু করা জরুরি। এতে পরিবেশ রক্ষা পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। এর জন্য প্রয়োজন হবে উন্নত ডিজাইন, আকর্ষণীয় প্যাকেজিং এবং মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গেও চামড়াশিল্প ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কুরবানির সময় গ্রামের অসংখ্য মানুষ চামড়া সংগ্রহ, পরিবহণ ও বিক্রির মাধ্যমে আয় করেন। শিল্পটিকে আধুনিকায়ন করতে পারলে গ্রামাঞ্চলের নারীদেরও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা চামড়ার ব্যাগ, মানিব্যাগ ও হস্তশিল্প তৈরি করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করতে পারবেন। এতে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। তাই এ শিল্পকে রক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।