নলেজ করিডোর নাকি আত্মঘাতী ফাঁদ: পাকিস্তান আমাদের কী শেখাবে?
গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপে যে দেশের অবস্থান পৃথিবীর সর্বনিম্নে, যেখানে প্রতি তিনজন শিশুর একজন শিক্ষাবঞ্চিত আর খোদ নিজেদের শিক্ষা বাজেটই কেটে করা হয়েছে এক-তৃতীয়াংশ—সেই পাকিস্তানের সঙ্গে ‘নলেজ করিডোর’ গড়ে তোলার ঘোষণা আপাতদৃষ্টিতে চমকপ্রদ মনে হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে আত্মঘাতী ফাঁদ। গত ১১ মে ঢাকায় এই কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন একে দুই দেশের সহযোগিতার এক ‘নতুন দিগন্ত’ ও ৫০০টি পূর্ণ অর্থায়নের ‘আল্লামা ইকবাল স্কলারশিপ’ দেওয়ার কথা বললেও একটি মৌলিক প্রশ্ন তিনি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন: সব সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে নিম্নগামী একটি রাষ্ট্রে গিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা এমন কী শিখবে, যা তারা নিজ দেশে কিংবা বাংলাদেশের সঙ্গে চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে এমন বিশ্বের অন্যান্য উন্নত ও নিরাপদ রাষ্ট্র থেকে শিখতে পারছে না?
প্রথমেই আসা যাক পাকিস্তানে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রসঙ্গে। ২০২৬ সালের কিউএস (QS) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, পাকিস্তানের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বিশ্বের শীর্ষ ৩৫০-এর তালিকায় নেই। কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৩৫৪তম এবং নাস্ট (NUST) ৩৭১তম অবস্থানে। অর্থাৎ, এই করিডোর যাই দিক না কেন, বিশ্বমানের শিক্ষা যে দিতে পারছে না তা স্পষ্ট।
স্কুল পর্যায়ের চিত্রও একই ধরনের। পাকিস্তানের ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের সাম্প্রতিক ২০২৪-২৫ সালের পিএসএলএম (PSLM) জরিপ অনুযায়ী, দেশটিতে প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার হার মাত্র ৬৩ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন; যেখানে বাংলাদেশের এই হার ৭৯ শতাংশ। এমনকি বালুচিস্তানে অর্ধেকেরও কম মানুষ লিখতে বা পড়তে পারে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, পাকিস্তানে ৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী ২.৫১ কোটি শিশু স্কুলের বাইরে রয়েছে, যা বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সেভ দ্য চিলড্রেনের মতে এই সংখ্যা ২.৬ কোটি—অর্থাৎ প্রতি তিনজন স্কুলগামী শিশুর মধ্যে একজন শিক্ষাবঞ্চিত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, যারা প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল, তাদের মধ্যে অর্ধেক ৫ম শ্রেণিতেই ঝরে পড়ে এবং ৭০ শতাংশ ঝরে পড়ে ১০ম শ্রেণিতে পৌঁছানোর আগেই। প্রতি তিনজনে মাত্র একজন যথাসময়ে মাধ্যমিক শেষ করতে পারে।
এর কারণও রহস্যময় কিছু নয়। পাকিস্তান বর্তমানে তাদের জিডিপির মাত্র ০.৮ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করছে, যা ২০১৮ সালে ছিল ২ শতাংশ; যেখানে ইউনেস্কোর মানদণ্ড অনুযায়ী এটি ৪ থেকে ৬ শতাংশ হওয়া উচিত। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে জনশিক্ষা খাতে ব্যয় ২৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পাকিস্তান সরকার যখন তাদের নিজেদের শিক্ষা বাজেট প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দিয়েছে, ঠিক সেই সময়েই এই ‘নলেজ করিডোর’ চালু করা হচ্ছে। যাদের নিজেদের শিক্ষার মান উন্নয়নে আগ্রহ নেই, তাদের পক্ষে অন্য একটি দেশের শিক্ষার মান উন্নয়নে আদৌ কোনো ভূমিকা রাখা সম্ভব? এই সহজ প্রশ্নটি কি আমাদের কর্তাব্যক্তিদের মাথায় আসছে না?
২০২৫ সালের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে ১৪৮টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান সর্বশেষ (১৪৮তম)। সুদান, চাদ এবং ইরানও পাকিস্তানের ওপরে অবস্থান করছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ২৪তম অবস্থানে থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষস্থান লাভ করেছে। পাকিস্তানে নারী শিক্ষার হার মাত্র ৫৪ শতাংশ, যেখানে পুরুষের শিক্ষার হার ৭৩ শতাংশ। ২০২৫ সালের ফেডারেল ক্যাবিনেটে নারী সদস্য সংখ্যা শূন্যে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশি কোনো ছাত্রী যদি এই করিডোরে আবেদন করে, তবে তার জন্য ক্যাম্পাসে কী অপেক্ষা করছে তা অভিভাবকদের গুরুত্ব সহকারে ভেবে দেখা দরকার। ২০২৩ সালে পাকিস্তানে ৭,০১০টি ধর্ষণের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে সিনেটর শেরি রেহমান জানান যে, নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের সাজা হওয়ার হার মাত্র ৫ শতাংশ। পাকিস্তানে নারীদের ক্ষমতায়ন, অধিকার এবং সুরক্ষায় কাজ করে এমন একটি সংস্থা দুখতার ফাউন্ডেশনের হেল্পলাইন অনুযায়ী, অভিযোগের ৮২ শতাংশই আসে নারী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে, যারা তাদের শিক্ষক বা অ্যাকাডেমিক কর্মীদের অভিযুক্ত করেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে লাহোর ও রাওয়ালপিন্ডিতে ছাত্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পাঞ্জাব কলেজ ফর উইমেনে এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ কেন্দ্র করে। আল জাজিরার রিপোর্ট অনুযায়ী, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০১৯ সালে বালুচিস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের গোপন ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা প্রমাণিত হওয়ায় উপাচার্য পদত্যাগ করেন। এই ঘটনাগুলো ক্যাম্পাসে জবাবদিহিতা ও নিরাপত্তার অভাবকেই নির্দেশ করে। যারা তাদের নিজেদের ছাত্রীর নিরাপত্তা দিতে পারে না, তারা আমাদের ছাত্রীদের নিরাপত্তা কীভাবে দেবে?
নিরাপত্তার বিষয়ে বলতে গেলে, ২০২৫ সালের গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সে পাকিস্তানের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়, যা কেবল বুরকিনা ফাসোর পেছনে। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সন্ত্রাসী হামলা ৫১৭ থেকে বেড়ে ১,০৯৯ হয়েছে এবং মৃত্যুহার বেড়েছে ৪৫ শতাংশ। টিটিপি (TTP) বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ৯৬ শতাংশ প্রাণহানি ঘটছে খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বালুচিস্তান প্রদেশে। এই করিডোরের ২০টি অংশীদার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা এখনো প্রকাশিত হয়নি; তবে ওই দুই প্রদেশে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলে তার জন্য বিশেষ ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রয়োজন, যা এই চুক্তিতে দেখা যাচ্ছে না।
ধর্মীয় ক্ষেত্রেও পাকিস্তান ‘বিশেষ উদ্বেগের দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত। সেখানে ব্লাসফেমি আইনের অপব্যবহার এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঝুঁকি অনেক বেশি। এই নলেজ করিডোরের আওতায় পাকিস্তানে আমাদের দেশের হিন্দু, খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ ছাত্র-ছাত্রীরা যেমন ঝুঁকির মুখে পড়বে, তেমনি যারা ইসলামের রক্ষণশীল ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন, তারাও বিপদে পড়তে পারেন।