ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসার ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ধীরগতির কার্যক্রম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। আর এই তথ্য বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দিয়েছেন বলে তিনি জানিয়েছেন। সরকারের যে সংস্থাগুলো আছে, সেগুলো খুব ধীরগতিতে চলে বলে বিনিয়োগ হয় না। এই তথ্যটি আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নেতিবাচক একটি খবর। কিন্তু এর সমাধান সরকারের পক্ষ থেকেই উদ্যোগ নিয়ে ইতিবাচক ধারায় ফেরাতে না পারলে এর ফল আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। এ কথা বলার অবকাশ নেই যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
শিল্প, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য কিংবা শিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ হলো টেকসই উন্নয়নের প্রাণশক্তি। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ বেশ কিছু বিনিয়োগের প্রস্তাব পেলেও কার্যকর হয়েছে খুবই কম। একজন উদ্যোক্তা তখনই বিনিয়োগ করেন, যখন তিনি বিশ্বাস করেন যে আগামী পাঁচ বা ১০ বছর তাঁর ব্যবসা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে সেই আস্থার জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
গত কয়েক বছরে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্বেগজনক অবস্থা নিয়ে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কমেছে, নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়েছে, অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন, আবার অনেকে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজছেন। বাজারে টাকার সংকটের চেয়েও বড় সংকট হলো ‘confidence crisis’ বা আস্থার সংকট। গত ১০ মে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত ‘সংকটে ব্যবসা, চাপে ভোক্তা’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ব্যবসা এবং ভোক্তাদের সার্বিক করুণ অবস্থার চিত্র উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদেন উঠে এসেছে, গত তিন বছরে অন্তত ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়েছে।
যেগুলো চালু আছে, সেগুলো চলছে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায়। একদিকে বেসরকারি খাত ঋণ পাচ্ছে না, অন্যদিকে সরকার ঠিকই খরচ মেটাতে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঋণ করেছে। জ্বালানি তেল ও এলপিজির বাড়তি দামে শিল্প-গৃহস্থালির পাশাপাশি বেড়েছে পরিবহন খরচ, যার প্রভাবে জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি আবারও বাড়তির দিকে। সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাপন কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। সরকারি কর্মচারীদের পে স্কেল দেওয়ার কথা থাকলেও টাকার অভাবে তা দেওয়া যাচ্ছে না। এই খাতে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি প্রয়োজন।
অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো, ভীতিকর অবস্থায় অর্থনীতি এগোয় না। আর বাংলাদেশে বর্তমানে সেই ভয় বহুস্তরীয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, চাঁদাবাজি, প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা, ব্যাংক খাত নিয়ে আতঙ্ক, জ্বালানিসংকট, উচ্চ সুদহার এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতি—সব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা এখন ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক।
বিশেষ করে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করা, হামলা কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগ ব্যবসায়ীসমাজের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ব্যবসা কখনোই প্রতিশোধের পরিবেশে বিকশিত হয় না। একজন উদ্যোক্তা যদি মনে করেন, যে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ব্যবসাও ঝুঁকিতে পড়ে যাবে, তাহলে তিনি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করবেন না—এটিই স্বাভাবিক।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যেসব দেশ দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি করেছে; যেমন—ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়া। তারা প্রথমেই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করেছে। তারা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে—১. নীতির স্থিতিশীলতা; ২. আইনের শাসন; এবং ৩. দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে এই তিন ক্ষেত্রেই উদ্বেগ বাড়ছে বৈ কমছে না। একজন বিনিয়োগকারী সবচেয়ে বেশি ভয় পান অনিশ্চয়তাকে। তিনি করের হার বেশি হলেও বিনিয়োগ করতে পারেন, কিন্তু নিয়ম প্রতিনিয়ত বদলালে বা প্রশাসনিক ঝুঁকি বাড়লে তিনি পিছিয়ে যান।
বিশ্বব্যাংক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সূচকে বারবার বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ‘Ease of Doing Business’ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যবসা শুরু করতে জটিলতা, লাইসেন্স পেতে দীর্ঘসূত্রতা, ঘুষ ও অনানুষ্ঠানিক ব্যয়—সব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা বাড়তি চাপের মুখে পড়েন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা। বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বহুদিন ধরেই খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল সুশাসনের সমস্যায় ভুগছে। কিন্তু বিগত ড. ইউনূসের সরকারের সময় সংস্কারের নামে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষই ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পেয়েছে। এমনকি এখনো সেই ভয় থেকে জনগণ বের হয়নি। বিশেষ করে বেশ কিছু বেসরকারি ব্যাংক খুব নাজুক অবস্থায় রয়েছে। গ্রাহকরাই তাঁদের জমানো টাকা ফেরত পাচ্ছেন না।
এ কথা আমরা সবাই জানি, ব্যাংকের ওপর আস্থা কমে গেলে মানুষ টাকা তুলে নেয়, ব্যাংক ঋণ দিতে ভয় পায়, ব্যবসায়ীরা নতুন প্রকল্প শুরু করতে পারেন না, শিল্পে উৎপাদন কমে যায় অর্থাৎ পুরো অর্থনৈতিক চক্র ধীর হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া এই সংকটের বড় লক্ষণ। উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না, আবার যাঁরা পাচ্ছেন, তাঁরা উচ্চ সুদের কারণে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এর ফলে কারখানায় উৎপাদন কমছে, নতুন চাকরি তৈরি হচ্ছে না। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে মূল্যস্ফীতিতে। মুদ্রাস্ফীতি শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়, এটি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের কষ্টের আরেক নাম। চাল, ডাল, তেল, গ্যাস, বাসাভাড়া—সবকিছুর দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ।
- ট্যাগ:
- মতামত
- ব্যবসা-বাণিজ্য
- রাজনৈতিক পরিবেশ