মানুষ কী করে বাঁচবে
মানুষ সংঘবদ্ধভাবে নানা লড়াই ও সংগ্রামের পর একটি রাষ্ট্র নির্মাণ করে। একটি সীমানার মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও আয়ের মানুষ তাদের প্রয়োজনমতো জীবিকার নিশ্চয়তা চায়। মানুষ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানায়। রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকে একটি সরকার, যারা সাধারণত জনগণের ভোটেই নির্বাচিত হয়। এখানেই সমস্যার শুরু।
রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাধারণত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বলে তাঁরা স্বাধীনভাবে মেধা ও বুদ্ধি খাটিয়ে রাষ্ট্রের আইনগুলো কার্যকর করে থাকেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাঁদের কাজের তদারকি ও রাষ্ট্রের আইনকানুন যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা দেখাশোনা করেন।
রাষ্ট্রের কাজই হচ্ছে মানুষের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদাগুলোর নিশ্চয়তা প্রদান করা। মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে, অন্যভাবে মৃত্যুবরণ করলে বা কর্মসংস্থান না থাকলে দেশে আন্দোলন, অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হয়। সে জন্য যেকোনো সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ন্যায়সংগত অধিকার। এই ন্যায়সংগত অধিকার আদায়ের জন্য যুগ যুগ ধরে প্রতিবাদী মানুষ আন্দোলন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। ফলে আন্দোলন করে কখনো সরকারের পতন হয়।
এরপর রাষ্ট্র নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করে থাকে। পৃথিবীর কিছু কিছু রাষ্ট্র এসব মেনে চলে এবং সর্বোচ্চ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নিজেদের নিয়োজিত করে। কিন্তু এর মধ্যে অধিকাংশ রাষ্ট্রেই এসব মান্য করা হয় না। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি মানুষের জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তবে আজকের দিনে প্রতিবাদের সীমাবদ্ধতাও আছে। মানুষ নানা কারণে বিভক্ত। সেই বিভাজিত জনগোষ্ঠী একত্র হয়ে কোনো আন্দোলন রচনা করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। যেসব দেশের অর্থনীতি দুর্বল, মানুষের আয় সীমিত, সেসব দেশের ব্যবসায়ীরা তখন দায়িত্বহীন ও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। আর যদি সেই শ্রেণির বিপক্ষে সরকার কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারে, তখন মানুষের অসহায়ত্বের আর শেষ থাকে না। এই ব্যবসায়ীরা জনগণের দুঃখ-কষ্টের কথা চিন্তা না করে, ছোট-বড় নানা ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি করেন। সিন্ডিকেটের যারা অংশ, তারা দ্রুত বিপুল অর্থের মালিক হয়ে যায়।
আমরা অবশ্য আশাই ছেড়ে দিয়েছি, এই রাষ্ট্রের পক্ষে ব্যবসায়ীদের কোনো ধরনের সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। মাঝে মাঝে দেখা যায় একজন ম্যাজিস্ট্রেট কয়েকজন পুলিশ নিয়ে কিছু কিছু জায়গায় যান, তা-ও কালেভদ্রে। দেশে অসংখ্য ম্যাজিস্ট্রেট আছেন তারপরেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। মোবাইল কোর্টকে কেন সব সময়ের জন্য সক্রিয় করা যায় না? যাতে সিন্ডিকেটওয়ালারা রণে ভঙ্গ দিতে পারে। জেল-জরিমানার অঙ্কও এমনভাবে বাড়ানো উচিত, যাতে করে যেন কোনো অবস্থাতেই তারা অন্যায় কাজে আর যুক্ত হতে না পারে।
জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে ভোক্তাশ্রেণির জীবনমান ক্রমাগত নিম্নমুখী হচ্ছে। ফলে পুষ্টির অভাবে বা পুষ্টিস্বল্পতার কারণে একটা শ্রেণি ক্রমাগতভাবে ছিন্নমূলের কাতারে চলে যাচ্ছে। আমাদের দেশে ছিন্নমূল হওয়ার অনেক প্রক্রিয়া আছে। যেমন মানুষ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়, নদীভাঙন, বেকারত্বের কারণে এ কাতারে চলে যেতে বাধ্য হয়। বিশেষ করে এনজিওর খপ্পরে পড়ে এবং মহাজনদের কাছ থেকে অধিক সুদে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত দ্রব্যমূল্যের কারণে অনেক মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের পক্ষে শহরের বস্তিতে থাকাও সম্ভব হচ্ছে না।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর বহু শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে কর্মরত বহুসংখ্যক কর্মী বেকার হয়ে পুনরায় গ্রামে ফিরে গিয়ে অনাহারক্লিষ্ট জীবনযাপন করছেন। বর্তমানে সিন্ডিকেটের কল্যাণে যেভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ছে, সেখানে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ ক্রমেই অসহায় হয়ে পড়ছেন। যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বহু বছর ধরেই একটা প্রবণতা লক্ষণীয়, ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ। অধিকাংশ ব্যবসায়ী নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যকে সুসংহত করার জন্য রাজনীতিতে এসেছেন। বিপুল অর্থের বিনিময়ে নির্বাচনে জয়লাভ করে প্রকৃত রাজনীতিবিদদের দেশ সেবার পথকে রুদ্ধ করছেন। তাঁরা সংখ্যায় যেমন বিপুল, তেমনি তাঁদের শোষণ করার নানা উপায়ও চতুর্দিকে প্রসারিত।
- ট্যাগ:
- মতামত
- নিরাপত্তা
- ব্যক্তিগত
- রাষ্ট্র পরিচালনা