বিএনপি সরকারের কাছে কী দেখতে চান রেমিট্যান্সযোদ্ধারা
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এই শ্রমিকেরা শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি নন; বরং দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে, যখন প্রবাসীরা ‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’-এর মতো কঠোর অবস্থান নিয়ে দেশের রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলেন। এই পদক্ষেপ ছিল শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়; বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা—রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি। এই পরিপ্রেক্ষিতেই বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রতি তাঁদের প্রত্যাশা আরও গভীর ও যৌক্তিক হয়ে ওঠে। তাই এই সরকার ক্ষমতায় আসার ১০০তম দিনে অভিবাসী শ্রমিকদের প্রত্যাশা মূল্যায়ন করা এখন সময়ের দাবি।
২০২৬ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ঘোষণাপত্রে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা দক্ষতা উন্নয়নকে একটি কেন্দ্রীয় কৌশল হিসেবে তুলে ধরে, যাতে দেশের জনশক্তিকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা যায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার কথাও বলা হয়।
অভিবাসন খাতকে এই বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষভাবে, নতুন শ্রমবাজার খোঁজার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে সুযোগ তৈরি করা যায়। দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়, যাতে শ্রমিকেরা উচ্চ আয়ের পেশায় প্রবেশ করতে পারেন।
রেমিট্যান্সব্যবস্থার আধুনিকীকরণের মাধ্যমে দ্রুত, নিরাপদ ও কম খরচে অর্থ পাঠানোর পরিবেশ গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ডিজিটাল নিবন্ধনব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে পুরো অভিবাসনপ্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক করার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া এক কোটি দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, যা দেশের রেমিট্যান্স আয় বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
এই প্রতিশ্রুতিগুলো প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করে। কারণ, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে একই সমস্যার সম্মুখীন হয়ে আসছিলেন। অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন যে এই নীতিগুলো বাস্তবায়িত হলে অভিবাসন খাতে একটি মৌলিক পরিবর্তন আসবে। ফলে নির্বাচনের পর সরকারের প্রথম দিকের পদক্ষেপগুলোর দিকে তাঁরা বিশেষ নজর রাখেন। এই প্রত্যাশা এখনো বহাল রয়েছে। কারণ, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত সরকারের সফলতা নির্ধারণ করবে। প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান কমানোই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
অভিবাসন খাতের প্রধান সংকটগুলো কী কী
বাংলাদেশের অভিবাসন খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়। একজন শ্রমিককে বিদেশে যেতে গিয়ে প্রায়ই তাঁর পরিবারের সঞ্চয় শেষ করতে হয় বা ঋণের বোঝা নিতে হয়। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যেতে একজন শ্রমিককে প্রায়ই ৩-৮ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়। এই ব্যয়ের বড় অংশ যায় দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগী বা অনিয়ন্ত্রিত এজেন্টদের হাতে, যারা কোনো জবাবদিহির মধ্যে থাকে না। ফলে শ্রমিকেরা বিদেশে গিয়ে প্রথম কয়েক মাস, এমনকি বছরজুড়ে শুধু ঋণ শোধ করতেই ব্যস্ত থাকেন। এই পরিস্থিতি তাঁদের জীবনমান উন্নয়নের সুযোগকে সীমিত করে, মানসিকভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে এবং রেমিট্যান্সের সম্ভাবনাকেও কমিয়ে দেয়। ঋণ শোধের লক্ষ্যে দিনের পর দিন বিরতিহীনভাবে অতিরিক্ত কাজ করতে গিয়ে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন, অনেকে মারাও যান।
দক্ষতার অভাব আরেকটি বড় সংকট, যা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে পিছিয়ে রেখেছে। অধিকাংশ শ্রমিক অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ হওয়ায় তাঁরা কম বেতনের কাজে নিয়োজিত হন এবং উন্নত দেশের উচ্চমানের চাকরির সুযোগ পান না। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল থাকে। দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়। কারণ, আধুনিক শ্রমবাজার এখন প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল।
শ্রমবাজারের সংকোচনও একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ ইতিমধ্যে তাদের শ্রমনীতি কঠোর করেছে এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ গোটা মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারকে নতুনভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। ফলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সুযোগ কমে যাচ্ছে এবং প্রতিযোগিতা বাড়ছে। নতুন বাজার, যেমন ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া বা আফ্রিকার দিকে নজর না দিলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এই বাস্তবতায় কৌশলগত কূটনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রবাসে শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতা একটি মানবিক সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। অনেক শ্রমিক বিদেশে গিয়ে বেতন বকেয়া, কর্মস্থলে নির্যাতন বা আইনি জটিলতায় পড়ে যান। দূতাবাসগুলোর সেবা অনেক সময় পর্যাপ্ত নয়, ফলে তাঁরা দ্রুত সহায়তা পান না। এই পরিস্থিতি শুধু শ্রমিকদের জন্য নয়, তাঁদের পরিবারের জন্যও মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে এই সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।