হামের প্রকোপ : জনস্বাস্থ্যে উদ্বেগ ও আমাদের করণীয়
বিশ্বজুড়ে সংক্রামক ব্যাধি নির্মূলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভাবনীয় সাফল্য সত্ত্বেও কিছু রোগ বারবার ফিরে এসে আমাদের জনস্বাস্থ্য কাঠামোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। হাম তেমনই একটি অত্যন্ত সংক্রামক ব্যাধি যা বর্তমানে বাংলাদেশে পুনরায় আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সম্প্রতি বাংলাদেশকে হামের ক্ষেত্রে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বারবার সতর্ক করে আসছিল যে, বিশ্বব্যাপী হামের প্রকোপ বাড়তে পারে।
ল্যানসেট ইনফেকশাস ডিজিজ জার্নালে প্রকাশিত তথ্যমতে, কোভিড-১৯ অতিমারির সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বিঘ্নিত হওয়া এবং জনগণের মধ্যে টিকা গ্রহণের প্রবণতা কমে যাওয়া এই প্রাদুর্ভাবের প্রধান নিয়ামক। যদিও আমার ল্যাবরেটরিতে বর্তমানে হামের সেরোলজিক্যাল কনফার্মেশন বা আণবিক পরীক্ষা করার সংস্থান নেই, তবুও ক্লিনিক্যাল ডাটা, অন্য ল্যাবের রিপোর্ট এবং মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদনগুলো একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে।
হাম একটি মরবিলিভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট রোগ। এটি মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে ভাইরাস বাতাসে প্রায় ২ ঘণ্টা ভেসে থাকে এবং আশপাশের অনাক্রম্য মানুষ সহজেই সংক্রমিত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর ‘R₀’ বা সংক্রমণ ক্ষমতা ১২–১৮; অর্থাৎ একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে আরও ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। বর্তমানে এত বেশি সংক্রমণ হওয়ার কারণ হলো, একজন আক্রান্ত শিশু তার চারপাশের অন্তত এক ডজন বা তার বেশি সুস্থ কিন্তু টিকা না নেওয়া শিশুকে আক্রান্ত করতে সক্ষম।
এ কারণেই হামকে পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি বলা হয়। ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪ কোটি শিশু তাদের হামের ডোজ মিস করেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’।
বাংলাদেশেও ইদানীং বিভিন্ন এলাকায় হামের ক্লাস্টার সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ২০২৫ থেকেই সতর্ক করেছিলেন যে, নিয়মিত ইপিআই কর্মসূচির বাইরে থাকা শিশুদের সংখ্যা বাড়লে একটি বড় প্রাদুর্ভাব অবশ্যম্ভাবী। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকা এবং উপকূলীয় দুর্গম অঞ্চলগুলোয় এই ঝুঁকি বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলছে, যদি দেশের ৯৫ শতাংশ শিশুকে হামের দুই ডোজ টিকার আওতায় না আনা যায়, তবে আমরা একটি বৃহত্তর মহামারির মুখোমুখি হতে পারি। হাম কেবল একটি রোগ নয় বরং এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য পঙ্গু করে দেয়, যাকে বলা হয় ‘ইমিউন অ্যামনেশিয়া’।
শিশুরা কেন বেশি আক্রান্ত হচ্ছে তার পেছনে গভীর মাইক্রোবায়োলজিক্যাল কারণ রয়েছে। জন্মের পর শিশু মায়ের শরীর থেকে অর্জিত নিষ্ক্রিয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। কিন্তু ৬ থেকে ৯ মাস বয়সের পর এই সুরক্ষার মাত্রা কমতে শুরু করে। ঠিক এই সময়েই প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া জরুরি।
জার্নাল অফ ইনফেকশাস ডিজিজেস-এর একটি গবেষণা বলছে, অপুষ্টির শিকার শিশুরা, বিশেষ করে যাদের শরীরে ভিটামিন-এ এর ঘাটতি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে হামের ভাইরাস অতি দ্রুত শ্বসনতন্ত্রের এপিথেলিয়াল কোষকে আক্রমণ করে।
শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পরিণত না হওয়ায় তারা ভাইরাসের প্রোটিনগুলো সঠিকভাবে শনাক্ত করে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না। ফলে জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি অন্ধত্বের ঝুঁকি তাদের ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শিশুর মৃত্যু
- প্রাদুর্ভাব
- হাম রোগ