দেশজুড়ে হামের প্রকোপ : বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকীগুলো কী বলছে
লেখাটি আমি যখন লিখছি তখন বিশ্বের আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী দুটি জার্নাল, সায়েন্স (Science) এবং দ্য ল্যানসেট (The Lancet)-এ প্রকাশিত দুটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন আমার হাতে রয়েছে। প্রতিবেদন দুটি এপ্রিল মাসের ২০-৩০ তারিখের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন।
সায়েন্স ও দ্য ল্যানসেট-এ কোনো বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ স্বাস্থ্য সমস্যা তখনই এসব আন্তর্জাতিক জার্নালে গুরুত্ব পায়, যখন তা বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যনীতি, মানবিক সংকট অথবা আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
হাম ভয়াবহ রকমের সংক্রামক একটি রোগ যেটি খুব দ্রুত একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পড়ে। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগ। হাম প্রতিরোধের জন্য সারা বিশ্বেই শিশুদের টিকা দেওয়া হয়। আমাদের দেশে শিশুদের ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে বিনামূল্যে ১ম ডোজ এমআর টিকা নয় মাস বয়সে এবং ২য় ডোজ ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়। তবে উন্নত দেশগুলোতে যেখানে এমএমআর টিকা ব্যবহৃত হয়, সেখানে সাধারণত প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ১২-১৫ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় ৪-৬ বছর বয়সে।
বাংলাদেশ বহু বছর ধরে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ছিল। হাম, পোলিওসহ অনেক রোগ দেশ থেকে নির্মূলের পথে ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে বাংলাদেশে এত বড় হামের প্রাদুর্ভাব এবং শিশু মৃত্যুর ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলকে বিস্মিত করেছে।
এই দুটি জার্নাল ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে। কোথাও এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার উদাহরণ, কোথাও এটি টিকাদান জরুরি অবস্থা, আবার কোথাও এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভঙ্গুরতার প্রতিফলন হিসেবে উঠে এসেছে।
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’ যা বলেছে
বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’ ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে ‘Measles explodes in Bangladesh after vaccination breakdown, killing hundreds of children’ শীর্ষক একটি অনুসন্ধানধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশে হামের এই বিস্ফোরণ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি টিকাদান ব্যবস্থার ব্যাঘাত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফল।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নিয়মিতভাবে শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (MR) টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হতো। এর পাশাপাশি প্রতি চার বছর অন্তর দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হতো, যাতে কোনো শিশু টিকার বাইরে না থাকে এবং অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ নিশ্চিত করা যায়, যা হাম প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত। বহু বছর ধরে ইউনিসেফ এই টিকা সরবরাহ করত এবং অর্থায়নের বড় অংশ প্রদান করত গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স। বাংলাদেশ সরকারও এই কর্মসূচিতে আর্থিকভাবে অংশগ্রহণ করত।
‘সায়েন্স’ বলছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এই ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থা বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্রভিত্তিক (open tender) পদ্ধতি চালু করে। এই ব্যবস্থায় সরকার বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান করে এবং যাচাই-বাছাই শেষে ক্রয়াদেশ প্রদান করে। ইউনিসেফ এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। সংস্থাটির আশঙ্কা ছিল যে নতুন ব্যবস্থা টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে এবং এর ফলে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। [তথ্যসূত্র: ১]
বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স-এর উদ্ধৃতি দিয়ে উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থার এ পরিবর্তন ও এর সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং বারবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছিলেন। রানা ফ্লাওয়ার্স ‘সায়েন্স’কে বলেছেন, তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমকে বলেছিলেন, “দয়া করে, এমনটি করবেন না।”
- ট্যাগ:
- মতামত
- প্রাদুর্ভাব
- হাম রোগ