কুতর্ক নয়, করণীয়: দেশপ্রেম জাগিয়ে দেশ গঠনের পথ
বহুতর্কে দিন বয়ে যায়
বিশ্বাসে ধন নিকটে পায়।
সিরাজ সাঁই ডেকে বলে লালনকে
কুতর্কের দোকান খুলিস নে আর।।
-লালন ফকির
‘কুতর্ক’ শব্দটি বাংলা ভাষায় একটি গভীর অর্থবহ ধারণা বহন করে। ‘কু’ মানে খারাপ বা ভ্রান্ত, আর ‘তর্ক’ মানে যুক্তি বা বিতর্ক। সুতরাং, কুতর্ক বলতে বোঝায়—এমন তর্ক বা যুক্তি, যা সত্যের অনুসন্ধান নয়; বরং ভুল প্রমাণ করা, বিভ্রান্ত করা বা নিজের অবস্থান জোর করে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিকৃত, অর্ধসত্য বা অসত্য যুক্তির আশ্রয় নেওয়া।
এখন আসি লালন ফকিরের গানের সেই পঙক্তিতে—
‘কুতর্কের দোকান খুলিস নে আর’
এই লাইনটির ভেতরে লালনের দর্শনের এক গভীর মানবিক ও আধ্যাত্মিক বার্তা লুকিয়ে আছে। এখানে ‘কুতর্কের দোকান’ বলতে বোঝানো হয়েছে—
এক ধরনের মানসিকতা, যেখানে মানুষ সত্য বোঝার জন্য নয়, বরং অহংকার, গোঁড়ামি বা নিজের মত চাপিয়ে দেওয়ার জন্য তর্ক করে। যেন কেউ যুক্তির নামে ‘দোকান’ খুলে বসেছে—যেখানে সত্য বিক্রি হয় না, বরং ভ্রান্তি আর আত্মপ্রবঞ্চনাই চলে।
লালন বলছেন, যে ব্যক্তি সত্যের পথ খুঁজে পেয়েছে, আত্মজ্ঞান বা মানবিক বোধে উন্নীত হয়েছে, সে আর এই ‘কুতর্কের দোকান’ চালায় না। কারণ—
সে বুঝে গেছে, তর্কে জয়লাভ করাই আসল নয়, সত্য উপলব্ধিই মূল বিষয়। অহংকার থেকে জন্ম নেওয়া তর্ক মানুষকে বিভক্ত করে। কুতর্ক মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। লালনের দর্শনে, সত্যিকারের জ্ঞানী ব্যক্তি তর্কপ্রবণ নয়, বরং সহিষ্ণু, উদার ও অনুসন্ধানী। সে প্রশ্ন করে, কিন্তু প্রশ্নের উদ্দেশ্য হয় বোঝা—জেতা নয়। কুতর্ক হলো এমন যুক্তি, যা আলো ছড়ায় না, বরং ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে। আর লালনের ভাষায়, সত্যসন্ধানী মানুষ সেই অন্ধকারের ব্যবসা ছেড়ে দেয়।
দুই.
আমরা কথা বলতে ভালোবাসি—দেশ নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে, উন্নয়ন নিয়ে। চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই তর্ক-বিতর্কের ঝড় ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কথার ভিড়ে কাজ কোথায়? আমরা কি সত্যিই দেশ গঠনের পথে হাঁটছি, নাকি কুতর্ক আর দোষারোপের বৃত্তে আটকে আছি?
আজকের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় সংকট হলো দায়বদ্ধতার অভাব। আমরা সবাই পরিবর্তন চাই, কিন্তু নিজের জায়গা থেকে পরিবর্তনের দায়িত্ব নিতে চাই না। রাষ্ট্রকে দোষ দেওয়া সহজ, রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করা সহজ, কিন্তু নিজের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা কঠিন। ফলে, কথার চর্চা বাড়ে, কাজের চর্চা কমে।