মমতার ‘রাজনৈতিক সন্ন্যাস’: পরাজয়ের ময়নাতদন্ত
যে বঙ্গে দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম দুর্গের পতন ঘটিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সেই পশ্চিমবঙ্গের মাটিই কি শেষ পর্যন্ত সরে গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ের তলা থেকে? টানা ১৫ বছরের একচ্ছত্র শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মসনদে এখন উড়ছে গেরুয়া নিশান। এই পরিবর্তন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং ভারতের রাজনীতির ইতিহাসের এক বিস্ময়কর বাঁক।
প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। মাত্র এক দশক আগে ২০১৬ সালে যেখানে মাত্র তিনটি আসনে জয়ী হয়ে রাজনীতির হালখাতা খুলেছিল, সেই দলটির জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক অভাবনীয় সাফল্য।
অবশ্য ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৭৭টি আসন পাওয়া বিজেপি যে এবার আগের চেয়ে ভালো ফল করবে, তা অনুমেয় ছিল। সে বছর বহু আসনে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই হয়েছিল; তৃণমূল যেসব আসনে জয়ী হয়েছিল, তার অনেকগুলোতেই ব্যবধান ছিল অল্প। কিন্তু রাজ্যের রাজনীতিতে হিসাব-নিকাশ বদলে দেওয়া এই দলটি যে মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে এমন এক ভূমিধ্বস বিজয় ছিনিয়ে আনবে, তা হয়তো অতি বড় রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কল্পনাকেও হার মানিয়েছে।
কিন্তু কীভাবে এল এই ভূমিধ্বস বিজয়? কী ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপরাজেয় দুর্গে পতন ঘটানো এমন জয়ের মূল কারণ?
ভোটারের নাম ‘এসআইআর’
এই ভোটকে সামনে রেখে গত বছরের শেষ দিকে হঠাৎ ভোটার তালিকার একটি বিশেষ শুদ্ধিকরণ অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়, যা সংক্ষেপে ‘এসআইআর’ নামে পরিচিত। এসআইআর এমন একটি অ্যাপভিত্তিক প্রক্রিয়া, যা ভোটার তালিকা থেকে নানা ভুলভ্রান্তি শনাক্ত করে এবং সন্দেহজনক ভোটারদের বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়।
প্রথম দফায় প্রায় সাড়ে সাত কোটি ভোটারের মধ্যে থেকে প্রায় ৯১ লাখ ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়। এটি নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক অসন্তোষ। রাজনৈতিক দলগুলোও বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসে। দেখা যায়, শুধুমাত্র নামের বানান ভুল বা সামান্য তথ্যগত অসঙ্গতির কারণেও অনেক বৈধ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছেন।
এরপর শুরু হয় আপিল প্রক্রিয়া। নিজেদের নাম তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে মানুষ হন্যে হয়ে বিভিন্ন দপ্তরে ছুটতে থাকে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে তুলনামূলকভাবে বেশি ভোটার বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। নানা যাচাই-বাছাই শেষে বাদ পড়ার সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৫১ লাখে!
চূড়ান্তভাবে বাদ পড়া এই ৫১ লাখ ভোটারের মধ্যে মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুর—এই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলোতেই প্রায় ১৬ লাখ নাম বাদ পড়েছে বলে দেখা যায়। এসব নাম এবারের ভোটে প্রভাব ফেলেছে কি না, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।
এর পাশাপাশি আরও একটি বিষয় আলোচনায় আসে—ভোট না দিলে নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা বা প্রচারের কারণে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক অংশগ্রহণের প্রবণতা তৈরি হয়। এর ফলেই ভোটদানের হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় বলে মনে করা হচ্ছে। বিজেপির বাইরে বাকি দলগুলো যে এ নিয়ে কোনো কার্যকর প্রতিবাদ গড়ে তুলতে পারেনি, এটিও পরাজয়ের একটি বড় কারণ।
মুসলমান ভোটারদের ওপর অতি নির্ভরতা
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের পরাজয়ের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে মুসলিম ভোটের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতাকে দায়ী করা হচ্ছে। অভিযোগ আছে, তিনি মুসলিম ভোটারদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। এর মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ, সামাজিক সুরক্ষামূলক নানা কর্মসূচি, মসজিদ সংস্কার ও সম্প্রসারণে সহায়তা এবং ইমামদের জন্য ভাতা চালুর মতো উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। এসব কর্মসূচির প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে ভোটব্যাংকে প্রতিফলিত হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, যেটি আবার হিন্দু ভোটারদের নাখোশ করেছে। অতীতের কোনো কোনো ভোটে ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ মুসলিম ভোট তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীদের পক্ষে গেছে।
তবে এবারের ভোটে সেই সমীকরণে পরিবর্তন হয়ে গেছে। শুধু মুসলিম ভোটারদের লক্ষ্য করে গত কয়েকে বছরের মধ্যে নতুন দুটি রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা নওশাদ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) এবং মুর্শিদাবাদের প্রাক্তন তৃণমূল নেতা হুমায়ুন কবীরের গঠিত আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেইউপি)।