আরব আমিরাতের ওপেক ত্যাগ সৌদির জন্য কতটা ধাক্কা
আগামী মাসেই তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন সৌদি আরবের জন্য স্পষ্ট বার্তা, তেমনি তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করার কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি উপসাগরীয় অঞ্চলে পুরোনো টানাপোড়েনকে আরও তীব্র করে তুলেছে, ঐক্য নয়, বরং বিভাজনই যেন সামনে এনে দিচ্ছে।
দেখতে গেলে, ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্তটি হঠাৎ কিছু নয়। বহুদিন ধরেই তেল উৎপাদন কতটা হবে—এই প্রশ্নে সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে মতবিরোধ ছিল। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে তেলের দাম ধরে রাখতে উৎপাদন সীমিত রাখতে চেয়েছে, অন্যদিকে আমিরাত বরাবরই বেশি উৎপাদনের পক্ষে ছিল। গ্লোবাল রিস্ক ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিশ্লেষক আর্নে লোহমান রাসমুসেনের কথায়, আমিরাত সব সময় ‘পরিমাণভিত্তিক কৌশল’-এর দিকে ঝুঁকেছে, আর সৌদিরা থেকেছে ‘দামভিত্তিক কৌশল’-এ।
এই পার্থক্যের পেছনে রয়েছে দুই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো। সৌদি আরবে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বাস এবং তাদের তেলের মজুতও আমিরাতের দ্বিগুণের বেশি। বিপরীতে আমিরাতে নাগরিকের সংখ্যা ১০ লাখের মতো। ফলে তেল আয়ের ভাগাভাগিও সেখানে তুলনামূলকভাবে সীমিত মানুষের মধ্যে হয়। সেই সঙ্গে আমিরাত বহুদিন ধরেই অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করে তেল উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
আমিরাতের ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্তটি অর্থনৈতিক যতটা, রাজনৈতিক ততটাই। সেন্টার ফর দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট-এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ গ্রেগ প্রিড্ডির মতে, সৌদি আরব নিজেই বাজার দখলে ফের মনোযোগ দেওয়ায় পুরোনো বিতর্কের গুরুত্ব কমে গেছে। তাই এই সিদ্ধান্ত মূলত রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে।
ঠিক এই সময়েই আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিচ্ছে এবং ইসরায়েলের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। সম্প্রতি জানা গেছে, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে আমিরাতকে সহায়তা দিতে ইসরায়েল একটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও প্রযুক্তিবিদ পাঠিয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
যদিও সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার ও আকাশপথে সহায়তা দিয়েছে, একই সঙ্গে তারা পাকিস্তানের মাধ্যমে মধ্যস্থতার চেষ্টাও চালিয়েছে। অন্যদিকে আমিরাত প্রকাশ্যে ও গোপনে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে আক্রমণ চালিয়ে যেতে চাপ দিয়েছে এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ঠেকানোর চেষ্টা করেছে।
এই অবস্থায় ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্তকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার কৌশল হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্প বহুদিন ধরেই ওপেককে ‘বিশ্বকে ঠকানো কার্টেল’ বলে সমালোচনা করে আসছেন। আটলান্টিক কাউন্সিলের গবেষক এলেন ওয়াল্ড মনে করেন, এটি হয়তো আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কোনো সমঝোতার অংশ, যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষায় সহায়তার বিনিময়ে ওপেককে দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে। এমনকি শিগগিরই কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তির ঘোষণাও আসতে পারে বলে তিনি ধারণা দিয়েছেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সংযুক্ত আরব আমিরাত
- তেল রফতানি
- ওপেক