হামে মৃত্যু: বাংলাদেশ কি ‘কাঠামোগত হত্যার যন্ত্রে’ পরিণত হচ্ছে?
রাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরনো ধারণা পাওয়া যায় এরিস্টটলের ‘পলিটিকা’ নামের অসাধারণ এক বইয়ের মাধ্যমে, যা পরবর্তীকালে ‘পলিটিক্স’ নামে ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করে। এই বইয়ের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল রাজনৈতিক দর্শন। তখনকার স্বাধীন ‘নগর রাষ্ট্র’ যেমন; এথেন্স বা স্পার্টাকে তিনি ‘পোলেস’ নামে অভিহিত করেন। সেই পোলেস বা নগর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন কী হওয়া উচিত, সেটির পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় এরিস্টটলের ‘পলিটিকা’য়। এই নগর রাষ্ট্রের সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য ও গুণগত পার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রের মূল ধারণা এই নগর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শন থেকেই উদ্ভূত।
এরিস্টটলের মতে, রাষ্ট্র এমন একটি সংগঠিত প্রচেষ্টা যার মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের জন্য ‘সর্বোচ্চ ভালো’ কিছু অর্জন করা। রাষ্ট্রের আদিমতম এই সংজ্ঞা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, একটি ভূখণ্ডে রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হলো ওই ভূখণ্ডের মানুষের জন্য ‘সর্বোচ্চ ভালো’ কিছু অর্জন করা; অন্যথায় সেটি পোলেস বা ‘রাষ্ট্র’ নয়।
আবার আধুনিককালের রাষ্ট্র দর্শনের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব হলো ‘সামাজিক চুক্তি’। এই সামাজিক চুক্তির প্রধান সমর্থক ছিলেন থমাস হবস, জন লক ও জাঁ জ্যাক রুশো। এই চিন্তাবিদগণ মনে করেন, মানুষ একটি সর্বজনীন কর্তৃত্বের অধীনে বসবাসের জন্য রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। কারণ হিসেবে থমাস হবস মনে করেন, মানুষ ‘ভয় ও নিরাপত্তা’র তাড়না থেকে রাষ্ট্রের মতো একটি সর্বজনীন কর্তৃত্বের অধীনে বসবাস করতে চায়। আবার জন লক মনে করেন, মানুষ নিজেদের ‘অধিকার রক্ষা’র জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। রুশো মনে করেন, মানুষ আইন তৈরিতে সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের ‘সামষ্টিক ইচ্ছা’ বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে।
এই তিন তাত্ত্বিকের যুক্তিতে মানুষের রাষ্ট্র গঠনের কারণ ভিন্ন ভিন্ন হলেও তাদের মূল আলোচ্য বিষয় হলো মানুষ রাষ্ট্র তৈরি করে নিজেদের কল্যাণের জন্য। অর্থাৎ মানুষ নিজেদের ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ‘নির্ভয়-নিরাপদ ব্যবস্থা, অধিকার সুরক্ষা বা সামষ্টিকভাবে হিতকর একটি ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়। একইভাবে সামাজিক চুক্তিতে বলা হয়, এই রাষ্ট্রকাঠামো যখন কল্যাণের বিপরীতে একটি নিপীড়নমূলক যন্ত্রে পরিণত হয়, মানুষ তখন নতুন রাষ্ট্র তৈরিতে উদ্বুদ্ধ হয়।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে আমরা একই সমীকরণ দেখতে পাই। পাকিস্তান নামক একটি নিপীড়নমূলক ‘পোলেস’-এর অপশাসন ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে পূর্ব বাংলার মানুষ একটি নতুন ‘পোলেস’ বা রাষ্ট্র গঠনের লড়াইয়ে নেমেছিল। সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব অনুযায়ী, বাংলার মানুষের এই আকাঙ্ক্ষা ছিল মূলত একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। ধর্ম, জাতীয় স্বার্থ বা নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে শোষিত হওয়া এক জনপদ নিজেদের ও উত্তরসূরিদের জন্য একটি বঞ্চনামুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদরদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। অগণিত প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত ওই স্বাধীন রাষ্ট্রের নাম দেওয়া হয় ‘বাংলাদেশ’। প্রত্যাশা ছিল, এই রাষ্ট্রের রাজনীতি বা ‘পলিটিকা’ হবে জনমুখী। কিন্তু ওই আশা দ্রুতই নিরাশায় পরিণত হয়।
নবাবী, ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলের মতোই সাধারণ মানুষ রাজনীতি ও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারেনি। উল্টো তারা বারবার ব্যবহৃত হয়েছে রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে; কখনো ক্ষমতারোহণের মাধ্যম, কখনো বা উন্নয়নের অজুহাত হিসেবে। ফলে সাধারণ মানুষ রয়ে গেছে উন্নয়ন-কাঠামোর বাইরে, আর ওই কাঠামো জীবনদায়ী না হয়ে ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে হন্তারক। যে রাষ্ট্রের হওয়ার কথা ছিল কল্যাণমূলক, তা আজ হয়ে উঠেছে নিপীড়ন ও নিষ্পেষণের যন্ত্র। ফলশ্রুতিতে, বাংলাদেশের মতো দুর্বল গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতাহীন সমাজ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রকাঠামো আজ মানুষের জন্য একেকটি মরণফাঁদ বিছিয়ে রেখেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের কাঠামোগত হত্যার ব্যাপ্তি বেড়েছে মাত্র। ফলে প্রতিনিয়ত কাঠামোগত হত্যার নানান বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে কাঠামোগত হত্যা তাই এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সড়ক ও পরিবহন, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্য খাতের দিকে তাকালেই এই মরণফাঁদগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দশকের পর দশক ধরে আমরা দেখছি মানুষ সড়কে প্রাণ হারাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়কে নিহত হয়েছেন ৩১,৫৭৮ জন। রাষ্ট্রের কাঠামোগত অবহেলা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিই প্রতি বছর এই লাশের মিছিল দীর্ঘ করছে।
পরিবেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রান্তিক মানুষ আজ চরম বিপন্ন। ভবদহের জলাবদ্ধতা তার জ্বলন্ত উদাহরণ; যেখানে রাষ্ট্রের অবহেলা বছরের পর বছর মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, বায়ুদূষণ, অনিরাপদ পানি ও দুর্বল স্বাস্থ্যবিধির কারণে দেশে প্রতি বছর ২ লাখ ৭২ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে। এই পবিবেশ বিপর্যয় দেশের ২০১৯ সালের জিডিপির ১৭.৬ শতাংশ খরচের সমপরিমাণ ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো বায়ুদূষণ, যা ৫৫ শতাংশ অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ী। এছাড়া নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া মানুষের আহাজারি তো আছেই। এই প্রতিরোধযোগ্য বিপর্যয়গুলো রাষ্ট্রের চূড়ান্ত উদাসীনতায় আজ আমাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে কাঠামোগত হত্যার সবচেয়ে ভয়াল ফাঁদ হলো জনস্বাস্থ্য খাত। সরকারের চরম উদাসীনতা ও অবহেলা কীভাবে নিমিষেই মানুষের জীবন বিপন্ন করে চলেছে তা আমরা প্রতি বছর দেখছি। ডেঙ্গুর মতো নিরোধযোগ্য রোগে প্রতি বছর শত শত মানুষের মৃত্যু রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতার প্রমাণ। ২০২৫ সালের এক গবেষণায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল দেখিয়েছেন যে, ২০২৩ সালে ৩ লাখ ২১ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং প্রাণ হারান ১,৭০৫ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমলেও ২০২৫ সালে সরকারের উদাসীনতায় তা আবারও বেড়ে ১ লাখ ছাড়ায় এবং মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪১২ জনে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শিশুর মৃত্যু
- প্রাদুর্ভাব
- হাম রোগ