জ্বালানি সংকট ও ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম
২০২৪ সালের মে মাসে অর্থাৎ শেখ হাসিনার পতনের মাস তিনেক আগে ‘দেশের বিদ্যুৎ খাত এবং ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম’ শিরোনামে যুগান্তরে একটি কলাম লিখেছিলাম। দেখিয়েছিলাম কীভাবে বিপর্যয়কেন্দ্রিক পুঁজিবাদ থেকে স্বজনতোষী পুঁজিবাদ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এবং এর ফলস্বরূপ দেশের জ্বালানি সংকট আরও একবার আমাদের সেই অপ্রত্যাশিত বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। কানাডিয়ান লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা নওমি ক্লেইন তার আলোচিত দ্য শক ডকট্রিন; দ্য রাইজ অব ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কোনো দেশে যদি প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট কোনো দুর্যোগ হয়, তাহলে সেই সুযোগে সেখানে নানা অর্থনৈতিক তৎপরতা শুরু করা যায়। নানারকম অর্থনৈতিক তত্ত্বের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি নেওয়া যায় নানা প্রকল্প। নওমি ক্লেইনের মতে, এসব তত্ত্ব ও প্রকল্প হয়তো সাধারণ অবস্থায় মানুষ গ্রহণ করত না। এমনকি হয়তো তীব্র প্রতিবাদ করত। কিন্তু প্রচণ্ড বিপর্যয়ের মধ্যে থাকা মানুষ এগুলোকে খুব সহজে মেনে নেয়; এমনকি সমর্থন পর্যন্ত করে। এটাকেই নওমি বলছেন ‘ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম’ বা ‘বিপর্যয়কেন্দ্রিক পুজিবাদ’।
নওমির পর একজন অস্ট্রেলিয়ান-জার্মান অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও লেখক অ্যান্টনি লোয়েন্সটেইন ২০১৫ সালে তার লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম : মেকিং এ কিলিং আউট অব ক্যাটাসট্রফিতে দাবি করেছেন, বিপর্যয়কেন্দ্রিক পুঁজিবাদ যতটা না প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সৃষ্ট, এর চেয়ে অনেক বেশি মানবসৃষ্ট। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিপর্যয়গুলো ছিল রাষ্ট্র বা সরকারসৃষ্ট। এবারের বিপর্যয় মানবসৃষ্ট (যুদ্ধ) হলেও তাতে বাংলাদেশ সরকারের কোনো দায় নেই। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নেওয়া দু-একটি পদক্ষেপ সরকারের অভিপ্রায় নিয়ে আমাদের সন্দিগ্ধ করে তোলে।
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ২০০১ সালের চারদলীয় জোট সরকার ক্রমাগত চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। এতে দেশব্যাপী লোডশেডিং দুর্বিষহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। পোশাক খাতসহ শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চারদলীয় জোট সরকারের পর এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেনি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধিতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। পরিস্থিতি যখন বেসামাল হয়ে পড়ল, তখন বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে সংসদে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ নামে একটা আইন পাশ করা হলো। এ আইনের ৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো ধরনের দরপত্র আহ্বান ছাড়াই কারও সঙ্গে আলোচনা না করে চুক্তি করার ক্ষমতা নেয় সরকার। এর মধ্য দিয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬’ অনুসরণ করার বাধ্যবাধকতাকে পাশ কাটানোর ব্যবস্থা করা হয়। এমনকি ৯ ধারায় বলা হয়, ‘এই আইনের অধীন কৃত, বা কৃত বলিয়া বিবেচিত কোনো কার্য, গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, প্রদত্ত কোনো আদেশ বা নির্দেশের বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতের নিকট প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’ পাশাপাশি ১০ ধারায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো প্রকার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার পথ বন্ধ করা হয়। শুরু হয় বিদ্যুৎ খাতে লুটপাটের মহোৎসব।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যদিও এখন পর্যন্ত জ্বালানি সংকটের কথা সরকারের দিক থেকে স্বীকার করা হয়নি। অপরিশোধিত তেল (ক্রুড) সংকটে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী দাবি করেছেন, ‘দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুত আছে এখন।’ তিনি হয়তো পরিশোধিত তেলের কথা বলেছেন। মন্ত্রী যখন এ দাবি করছেন, তখন দেশের ডিজেল ও গ্যাস সংকটে ৬১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ। মন্ত্রী যখন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য দেখছেন না এবং লোডশেডিংয়ের বিষয়ে প্রশ্ন করায় সাংবাদিককে একরকম ধমকের সুরে থামিয়ে দিচ্ছেন, ঠিক তখনই দেশের মূলধারার গণমাধ্যম দেশের কোথাও কোথাও দিনে ৫-৬ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের তথ্য দিচ্ছে। গ্যাস সংকটে ইতোমধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি সার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে এই তথ্য না থাকার কোনো কারণ নেই। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সরকারসংশ্লিষ্ট কেউ সংকটের কথা স্বীকার করেননি। বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারাই যখন থাকেন, তারা এক্সট্রিম ডিনায়াল সিনড্রোমে ভোগেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জ্বালানি সংকট