শিক্ষা কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি
দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশল প্রণয়নের জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেছে। কমিটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়ন করবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিতকরণের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা প্রণয়ন করাই হবে এ কমিটির প্রধান লক্ষ্য বা কাজ। এটি একটি ভালো উদ্যোগ। বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যে পর্যায়ে রয়েছে, তাকে গতিশীল এবং সঠিক ধারায় প্রবাহিত করার জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, সরকার অর্থনৈতিক বা সামাজিক যে উদ্যোগই গ্রহণ করুন না কেন, তা এমনি এমনি বাস্তবায়িত হবে না। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি, যারা গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিবেদিত থাকবেন। তাই অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটি গঠনের পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের একটি শিক্ষা কমিশন গঠন খুবই জরুরি। উপযুক্ত ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত জনবল একটি দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। দক্ষ জনশক্তি নিশ্চিত করা না গেলে যে কোনো সুন্দর পরিকল্পনাও ব্যর্থ হতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর জনগণ একটি গণতান্ত্রিক সরকার পেয়েছে। এ সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সেই প্রত্যাশাকে ধারণ করেই সরকারের কার্যক্রম পরিচালিত হতে হবে। জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠনের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাজমান সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা যারা শিক্ষার জগতে বিচরণ করছি, তারা শিক্ষা খাতের সমস্যা সম্পর্কে মোটামুটি অবহিত রয়েছি। তারপরও একটি উচ্চপর্যায়ের শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। যারা শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন, দলমতনির্বিশেষে তাদের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের এ কমিশন গঠন করা যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা হচ্ছে একটি জাতির সবচেয়ে মূল্যবান ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। এ খাতে বিনিয়োগ করলে তা ব্যর্থ হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
স্বাধীনতা-পরবর্তী দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষা কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। শিক্ষিতের হার বেড়েছে। কিন্তু শিক্ষার মান কি প্রত্যাশিত মাত্রায় বেড়েছে? এখানে প্রশ্ন রয়ে গেছে। যেনতেনভাবে সার্টিফিকেট লাভ করাকেই শিক্ষা অর্জন বলা যায় না। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের সুপ্ত ও সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে তাকে সর্বক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে গড়ে তোলা। প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায় পর্যন্ত সর্বত্র শিক্ষার মানের অবনতি প্রত্যক্ষ করা যায়। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে গবেষণার প্রতি নিদারুণ অনাসক্তি লক্ষ করা গেছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট অর্জন করে একটি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারলেই শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্য সাধিত হবে। এমন একটি সময় ছিল, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে শিক্ষার্থীরা বসার সিট পেত না। আর এখন শিক্ষার্থীরা পারতপক্ষে গ্রন্থাগারমুখী হতে চায় না। পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত পুস্তকগুলো ইংরেজি ভাষায় রচিত। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুর্বলতা লক্ষ করা যায়। যেহেতু তারা ইংরেজি বই থেকে পাঠোদ্ধার করতে পারে না, তাই পূর্ববর্তী শিক্ষার্থীদের নোটের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। গত শতাব্দীর ছয়ের দশক পর্যন্তও উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হতো। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর নামে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার প্রতি যে অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়, তার ফল এখন আমরা ভোগ করছি। উচ্চশিক্ষা অর্জনকারী অধিকাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি দূরে থাক, বাংলা ভাষাও সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, আবেগ দিয়ে কখনোই জাতীয় উন্নয়ন অর্জন করা যায় না। স্বাধীনতার পর যদি বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো, তাহলে আমাদের এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে হতো না। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে ইংরেজি ভাষাচর্চার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
রাষ্ট্রীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে প্রতিবছর যে ব্যয় বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা খুবই অপ্রতুল। ইউনেস্কো একটি দেশের মোট জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের সুপারিশ করেছে। এ অর্থের একটি বড় অংশই শিক্ষা গবেষণায় ব্যয় করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের হার জিডিপির ২ শতাংশেরও কম। এ অর্থের একটি বড় অংশই অবকাঠামোগত নির্মাণকাজে ব্যয় করা হয়। ফলে গবেষণাকর্মের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ পাওয়া যায় না। শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। একবারে হয়তো জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হবে না। তবে পর্যায়ক্রমে আমাদের এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। প্রতিটি পর্যায়ে উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।
পূর্ববর্তী বিএনপি সরকার আমলে (১৯৯১-৯৬) দেশে প্রথমবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে একজন শিক্ষার্থী যাতে ঝরে না পড়ে, তা নিশ্চিতকরণ এবং সর্বজনীন শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এ উদ্যোগের সঙ্গে আমি নিজেও যুক্ত ছিলাম। কিন্তু যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, তা কতটা সফল হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা যেতে পারে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে উপযুক্ততা ও উপযোগিতা বিবেচনা করা হয়নি। ফলে অনেকেই বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন ঠিকই; কিন্তু এতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অধঃপতন ঘটেছে মারাত্মকভাবে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব শর্ত পরিপালন করতে হয়, তা উপেক্ষিত হয়েছে। এ মুহূর্তে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান এবং পাঠদানের সুবিধার বিষয়টি বিবেচনা করে ঘাটতি পূরণের জন্য পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা বিস্তারের শর্তাবলি পূরণ করতে পারবে না, তাদের বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে। শিক্ষা কখনোই বাণিজ্যিক পণ্য হতে পারে না।
দেশে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কর্মমুখী নয়। ফলে একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষাজীবন শেষ করে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাশের হার বাড়ানোর প্রতি যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, ঠিক ততটাই অবজ্ঞা করা হয়েছে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষিত আত্ম-অহমিকাপূর্ণ বেকার তৈরি করছে মাত্র। একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষাজীবন শেষে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। আর কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলেও তা যে তার অধিত শিক্ষা ব্যাকগ্রাউন্ড মোতাবেক হবে, তা নিশ্চিত নয়। দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থী হয়তো ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, কিন্তু তার চাকরি হয়েছে ব্যাংকে। অথচ ইতিহাস রিলেটেড কোনো কাজে তাকে নিযুক্ত করা গেলে তার কাছে থেকে প্রত্যাশা মোতাবেক ফলাফল পাওয়া যেত।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শিক্ষা ব্যবস্থা
- কমিশন গঠন