মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা

যুগান্তর ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:২৪

আজ পহেলা বৈশাখ, বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ নববর্ষ। দেশব্যাপী বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে পহেলা বৈশাখ। এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে আমরা বাংলা ১৪৩৩ সালকে বরণ করে নিতে যাচ্ছি। দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরাচারী দুঃশাসন এবং দেড় বছরের অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামল পেরিয়ে মানুষ মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিতে যাচ্ছে। সব ধরনের অনাচার-অবিচারমুক্ত কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয় নিয়ে আমাদের কাছে উপস্থিত হয়েছে বাংলা ১৪৩৩ সাল। নানা কারণেই এ বছরের পহেলা বৈশাখ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়। রুদ্ধ পরিবেশে সীমাহীন যন্ত্রণার মাঝে কখনো আনন্দ উৎসব করা যায় না।


বিগত দিনগুলোতে বাংলাদেশের মানুষ গতানুগতিকভাবে পহেলা বৈশাখ পালন করেছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এদেশের মানুষ আবারও নতুন করে মুক্ত পরিবেশে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করেছে। বাংলাদেশ এক নতুন পরিস্থিতিতে পালন করতে যাচ্ছে পহেলা বৈশাখ। এক সুন্দর স্বপ্নময় অনুভূতি নিয়ে আমাদের দ্বারে উপস্থিত হয়েছে বাংলা ১৪৩৩ সালের প্রথম দিন।


পৃথিবীতে অনেক জাতি আছে যাদের কোনো নিজস্ব সন নেই। সেদিক থেকে বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে, আমাদের একটি মর্যাদাপূর্ণ সাল রয়েছে। আমাদের একটি ক্যালেন্ডার আছে। পৃথিবীতে যেসব সাল বা সন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে, বাংলা সাল এর অন্যতম। এ উপমহাদেশেই অনেক সাল আছে, কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগই এখন বিলুপ্তপ্রায়। কিন্তু বাংলা সন দিন দিন উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, স্বমহিমায় তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। যতই দিন যাচ্ছে, বাংলা সালের মহিমা ততই বাড়ছে। আগামীতে বাংলাবর্ষের গুরুত্ব ও তাৎপর্য আরও বাড়বে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। বাংলা সন এ অঞ্চলের মানুষের গর্বের ধন।


বাংলাবর্ষের ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। ১৬০০ শতাব্দীর আটের দশক পর্যন্ত আমাদের দেশের মানুষ মূলত হিজরি ও গ্রেগরিয়ান সনকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের নিত্যদিনের কাজকর্ম সম্পাদন করতেন। সেসময় চান্দ্রমাস অনুযায়ী দিন-তারিখ গণনা করা হতো। কিন্তু এতে বেশকিছু সমস্যা দেখা দেয়। মোগল সম্রাট আকবরের আমলে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়। সেসময় চান্দ্রমাস অনুযায়ী বছরের প্রথম দিন রাজস্ব বা খাজনা আদায় করা হতো। কিন্তু এতে দিন-তারিখের সমন্বয় সাধন করার ক্ষেত্রে সমস্যা হতো। চান্দ্রমাস অনুযায়ী প্রতিবছর ১১ থেকে ১২ দিন এগিয়ে আসে। ফলে খাজনা আদায়ের নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা কঠিন হতো। এ সমস্যার সমাধানে সম্রাট আকবর সেসময়ের বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও জ্ঞানতাপস সৈয়দ মীর ফতেহউল্লাহ সিরাজিকে দায়িত্ব অর্পণ করেন। ফতেহউল্লাহ সিরাজি নানা দিক বিশ্লেষণ করে একটি নতুন সন প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। ১৫৮৪ সালের ১০ মার্চ নতুন বাংলা সন প্রণয়ন করা হয়, তবে তা কার্যকর করা হয় দুবছর পর, ১৫৮৬ সালের ১৬ মার্চ সম্রাট আকবরের রাজ্যাভিষেকের দিন থেকে।


বাংলা সন প্রবর্তনের মূল কারণ আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা বিধান করা। প্রজাদের কাছ থেকে বকেয়া রাজস্ব বা খাজনা আদায়ের জন্যই বাংলা সাল প্রবর্তন করা হয়। প্রতিবছর চৈত্রসংক্রান্তিতে রায়তরা তাদের বকেয়া খাজনা জমিদারদের মাধ্যমে সম্রাটের কোষাগারে জমা দিতেন। যারা নির্ধারিত দিনে রাজস্ব বা খাজনা জমা দিতেন, তাদের মিষ্টিমুখ করানো হতো। সম্রাটের পক্ষ থেকে জমিদার ও তালুকদাররা বংশানুক্রমে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালন করতেন। আনুষ্ঠানিকভাবে রাজস্ব জমা দেওয়ার সময় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হতো। এ অনুষ্ঠানকে ‘পুণ্যাহ’ বলা হতো। রাজস্ব আদায়ের এ ইস্যুটি শুধু জমিদার-তালুকদারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একসময় ব্যবসায়ীরা তাদের গ্রাহকদের কাছ থেকে বকেয়া পাওনা আদায়ের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তারা চৈত্রসংক্রান্তিতে গ্রাহকদের নিমন্ত্রণ জানাতেন। গ্রাহকরা সেই নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে তাদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করতেন। ব্যবসায়ীরা তাদের গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করাতেন। ব্যবসায়ীরা তাদের বিগত বছরের হিসাবের খাতা বন্ধ করে নতুন হিসাবের খাতা খুলতেন।


পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা বছরের সূচনা হয়েছিল মূলত আর্থিক কারণে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা শুধু আর্থিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি একটি সর্বজনীন আনন্দ উৎসবে পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা আয়োজনের মাধ্যমে পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। ধর্মমত নির্বিশেষে সবাই এ অনুষ্ঠানে শামিল হয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। নানা ধরনের খেলাধুলার ব্যবস্থা করা হয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পহেলা বৈশাখ সবার অন্তরের অনুষ্ঠান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে আনন্দ শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সালে রাজধানীতে ঢাকা চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে। তখন এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা।’ আনন্দ শোভাযাত্রা সংস্কৃতিমনা মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। এরপর ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হলে বৈশাখী ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’র নামকরণ করা হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা।’ এভাবেই চলছিল। কিন্তু এক সময় মঙ্গল শোভাযাত্রা নাম নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি ও সমালোচনা উত্থাপিত হলে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত বছর এর নামকরণ করা হয় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’।


সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছেন, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে এবারও অতীতের মতোই শোভাযাত্রার আয়োজন করা হবে। এবারের বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘নববর্ষের ঐকতান/গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। এতে বিশাল আকৃতির লাল ঝুঁটির মোরগ, পায়রা, দোতারা নিয়ে নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা নামবে রাজধানীর রাজপথে। তবে সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে, এবার রাজধানীতে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে যে আনন্দ মিছিল হবে, তার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। মঙ্গল বা আনন্দ শোভাযাত্রা নয়, এবারের আনন্দ মিছিলের নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইউনেস্কোকে মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হবে।


বাংলা সনের বেশ কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৬৬ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সংস্কারটি ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলা বছরের প্রথম ৫ মাস ৩১ দিন, পরবর্তী মাসগুলো ৩০ দিন এবং ফাল্গুন মাস ৩১ দিন ধরা হয়। পরবর্তী সময়ে এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখকে স্থির করে পহেলা বৈশাখ পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই থেকে প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ পালন করা হয়।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও