প্রয়োজন প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব
সম্প্রতি একটা খবর বেশ আলোচিত হয়েছে, স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা কমানো হবে। শুনে অবাক, খটকাও লাগল। খটকা লাগার অবশ্য বড় কোনো কারণ ছিল না। কেননা, আমাদের দেশে দলীয় সুবিধা প্রদানের অদ্ভুত কিছু রীতি চালু রয়েছে।
যিনি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনে পরাজিত হন, দল ক্ষমতায় গেলে তিনি পরবর্তী সময়ে কোনো কোম্পানি বা করপোরেশনের পরিচালক অথবা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়ে থাকেন। এমন ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির যোগ্যতা কোনো মাপকাঠি নয়। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাঁর জানাশোনা, পরিকল্পনা, দক্ষতা বা সৃজনশীলতা মুখ্য নয়। দেখা যায়, একজন আপাদমস্তক দলবাজ মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন। খুব সামান্য ব্যতিক্রমসহ এ রকম অনেক উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে।
মনোনয়ন বা নিয়োগ নিয়ে সাধারণভাবে আপত্তি করার কোনো কারণ নেই। ক্ষমতাসীন দল যেখানে সুযোগ আছে, সেখানে তার সমর্থকদেরকেই দায়িত্ব দেবে—এটি স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে প্রশ্ন হলো, স্কুল-কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে কর্তৃপক্ষ সরাসরি দলের সমর্থক কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতেই পারে। কিন্তু আমরা চাই সেই নেতৃত্ব হোক প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব। যদিও আমরা জানি রাজনৈতিক, বিশেষত সরকারি দলের মানুষের একটা ভার আছে।
ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি একজন নেতা, পরিচালক, পথপ্রদর্শক। স্কুল বা কলেজের পরিচালনা পর্ষদকে তিনি নেতৃত্ব দেবেন। নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিভিন্ন সমস্যায় সমাধান দেওয়া, প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন নতুন পথ খুঁজে বের করা তাঁর কাজ হবে। এ গোটা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সংগত কারণেই মানুষটিকে চিন্তাশীল, সমদর্শী ও দূরদর্শী হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে পড়াশোনা জানলেই তিনি অমন সব বৈশিষ্ট্য অর্জন করে ফেলবেন, এমনটি ভাববার কোনো কারণ নেই। তবু সাধারণভাবে বলা যায়, শিক্ষিত হলে যেকোনো বিষয় সহজে বুঝে ফেলার মতো সক্ষমতা বেশি থাকে। অন্ততপক্ষে কিছুটা দীপ্তির সন্ধান তাঁর কাছে পাওয়া যেতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমে দেখলাম অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন এবং মনে হয়েছে প্রশ্নটি সংগত যে, সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা কমানো হবে কেন? দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৫০ ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা মুরগির ছানার মতো বাড়ছে, অর্থাৎ পড়াশোনা জানা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সেখানে যেকোনো অ্যাসাইনমেন্ট বা নিয়োগের যোগ্যতা কোন যুক্তিবলে হ্রাস করা হবে! আর সেটা যেনতেন জায়গা নয়—খোদ শিক্ষার কেন্দ্রে।
শিক্ষা নিয়ে একটা হেলাফেলার মনোভাব আমাদের চিরদিনই ছিল। হয়তো সেটা সচেতনভাবেই। ব্রিটিশরা তাদের শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে আমাদেরকে সুবিধাভোগী অবস্থানে অধিষ্ঠিত হওয়ার একটা ন্যায়ানুগ পথ হিসেবে চিহ্নিত করে দিয়ে গেছে। দুর্ভাগ্য হলো, যুগের পর যুগ এ জন্য ব্রিটিশকে দায়ী করলেও কখনো আমরা সে ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করিনি। অথচ ব্রিটিশরা কিন্তু সেই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে কখনো ছিল না, এখনো নেই।
সাম্প্রতিককালের একটা উদাহরণ টানি। দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নিয়েই প্রথমে ১১টা সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল এবং তা নিয়ে রাষ্ট্রে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। সেসব সংস্কারের কপালে কী জুটেছে, তা দেশ ও জাতি জানে এবং ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে জানবে। এ ক্ষেত্রে আমরা যেটা লক্ষ করলাম, এত এত কমিশনের মধ্যে শিক্ষা সংস্কার-সংক্রান্ত কোনো কমিশন ছিল না। অথচ কে না জানে, যদি এ দেশে শিক্ষাব্যবস্থাটা এমন হতো যে সেখানে নৈতিক, বিবেকবান, নির্লোভ, দায়িত্বপরায়ণ মানুষ সৃষ্টির পথ উন্মুক্ত থাকত, তাহলে দেশ এতটা পিছিয়ে থাকত না। সবদিক থেকেই এগিয়ে যেত। বিশ্বাস করা যায়, হয়তো অন্য অনেক সংস্কারের দরকারই হতো না।
বলা হয় শাসককুল নাকি শিক্ষাকে ভয় পায়। এই পুরোনো আমলের আপ্তবাক্য এখনো মানতে হবে আমাদের! অথচ শাসকেরা ভয় পাক আর না পাক—কারও শাসনকাল যে চিরস্থায়ী নয়, এটা অবধারিত। তাহলে কেন তারা সংস্কারের উদ্যোগ নেবে না! ভয় কোথায়! বরং সৎ-সংস্কারের পথে গেলেই আবার জনগণের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে কমল হীরের পাথর আর তার আলো প্রসঙ্গে অমিতের একটা বাণীর শেষ দিকে বলা হয়েছে, ‘পাথরের ভার আছে; আলোর আছে দীপ্তি’। আলোচ্য ক্ষেত্রে আমরা যদি রাজনৈতিক কোনো ব্যক্তিকে পাথর ধরে নিই কিন্তু তাঁর যদি দীপ্তি না থাকে, তাহলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। অতএব, আমাদের পাথর এবং দীপ্তি দুটোই খুঁজতে হবে।