গরুবৃত্তান্ত, মধ্যবিত্তের ঈদ ও আব্বার ডায়েরি
আশির দশকের মাঝামাঝি। বর্ষাকাল। সন্ধ্যা থেকে অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে। এ রাতেই ঘটে যায় এক দুর্ঘটনা। সকালে হইচই। গোয়ালঘরে রয়েছে কেবল একটি ষাঁড়। বাকি তেরোটি নিয়ে গেছে গরুচোরে । এ সময় গ্রামে গরু চুরি ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।
আশির দশকে চাষাবাদ ছিল গরুনির্ভর। গরুগুলো চুরি হয়ে গেলে আব্বা ও বড় চাচার মাথায় হাত পড়ল। কারণ, ভরা বর্ষায় জমি চাষ চলছে। কী হবে চাষাবাদের, খেতখামারের? আব্বা গোয়ালে গিয়ে মন খারাপ করে ষাঁড়ের উদ্দেশে বললেন, তুই যাসনি কেন? ষাঁড়টি আব্বার কথা শুনে নিচের দিকে মাথা নিচু করে কী জানি বলতে চাইল।
এ ষাঁড়ের কাছে আব্বা ছাড়া কেউ ভিড়তে পারত না। অসম্ভব মারকুটে ও জেদি ছিল সে। আব্বা বললেন, অনেক দিন শুয়ে-বসে খেয়েছিস, এবার জমিতে নামতে হবে। সে লাঙল টানতে অভ্যস্ত ছিল না। আব্বা তাকে শখ করে পুষেছিলেন। এক ষাঁড় দিয়ে তো আর লাঙল চাষ হয় না। এ সময় গরু কেনার মতো টাকাপয়সা আব্বার হাতে ছিল না। সাহায্যে এগিয়ে এলেন রাজশাহী জেলার মোহনপুর উপজেলার ধুরইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্বার বন্ধু মজিদ মোল্লা। তিনি তাঁর গোয়াল থেকে একটি অজোয়াল (লাঙল টানতে অভ্যস্ত নয়) ষাঁড় পাঠালেন।
দুটি ষাঁড়ই অজোয়াল। কিষান কবিরাজ মাঝির সহযোগিতায় আব্বা তাদের প্রশিক্ষিত করলেন। কবিরাজ মাঝিকে বললেন, তাদের যেন মারধর না করা হয়। আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হোক। ষাঁড় দুটি বেশ দ্রুত লাঙল টানতে অভ্যস্ত হলো।
ষাঁড় দুটির বেশ সখ্য হলো। তাদের তুলতুলে কাঁধে জোয়ালের দাগ পড়ল। দুপুরে জমি চাষের পর বিকেলে আর নড়াচড়া করতে পারত না। হয়তো তাদের শরীর ব্যথা করত। আব্বা তাদের জন্য খৈল-ভুসি বাড়িয়ে দিলেন। আমাদের পরিবারে আগামী দিনের অর্থনীতি এ দুটি অজোয়াল ষাঁড়ের কাঁধের ওপর পড়ল। অবশেষে দুজন মিলে আবাদ উঠিয়ে দিল।
এবার মজিদ ভাইয়ের ষাঁড়টির ফেরার পালা। যেদিন আব্বা ষাঁড়টিকে ফেরত পাঠালেন, সেদিন তাকে ভালো করে খৈল-ভুসি এবং ভাতের মাড় খাওয়ানো হলো। ষাঁড়টির শিং দুটিতে শর্ষের তেল মাখিয়ে দেওয়া হলো। ষাঁড়টি যখন চলে যাচ্ছে, আমাদের বাড়ির ষাঁড়টি উচ্চ স্বরে হাম্বা হাম্বা ডাকা শুরু করল। দুজন দুদিক থেকে ডাকতে লাগল।
আমাদের বাড়ির ষাঁড়টি বাঁধা ছিল। সে দড়ি ছেঁড়ার চেষ্টা করতে লাগল, পা দিয়ে মাটি খোঁড়া শুরু করল। সঙ্গী ষাঁড়টি যখন চোখের আড়ালে চলে গেল, তখন সে ঝিমিয়ে পড়ল। ষাঁড় দুটির পার্টিশন মেনে নেওয়া সহজ ছিল না। পরে আব্বা কাঁকনহাট থেকে সঙ্গী হিসেবে আরেকটি গরু কেনেন। কিন্তু ষাঁড়টি তার সঙ্গে পুরোপুরি অ্যাডজাস্ট করতে পারেনি। প্রায়ই সে নতুন সঙ্গীর ওপর চড়াও হতো।
গত শতাব্দীর আশির দশকে দেখেছি মধ্যবিত্ত কৃষকেরা গোয়ালের গরু কোরবানি দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। এর পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে; এক. সক্ষমতার অভাব; দুই. পোষা গরুর প্রতি মায়া। এমন ধারণা রয়েছে, যা মন কাঁদাই তা বেশি গ্রহণীয় হয়। আব্বা ষাঁড়টি কোরবানি করলেন। সেবার আমি কোরবানিতলা থেকে অনেক দূরে ছিলাম। ষাঁড়ের মাংস খেতে পারিনি।
গরু আপন ঠিকানা ছাড়তে চায় না
১৯৯৪ ঈদুল আজহা সামনে। আব্বা বললেন, দেখো একটা গরু কেনা যায় কি না? পাঁচ হাজার টাকা দিলেন। তানোর থানার কাশিমবাজার থেকে কেনা হলো গরু। পাকা রাস্তা দিয়ে গরু নিয়ে হাঁটছি। হঠাৎ পেছন থেকে বাসের হর্ন। গরু ভয় পেয়ে হাতের দড়ি ছুটিয়ে লেজ তুলে দৌড় শুরু করল। আমরা গরুর পেছন পেছন দৌড়াচ্ছি। গরুটি কিছুদূর যায় আর পেছনে ঘুরে দেখে। আবার দৌড়ায়। ওর সঙ্গে আমরা কুলিয়ে উঠতে পারছিলাম না।
কিছুক্ষণ পর গরুটি গ্রামের মধ্যে ঢুকে গেল। সেই গ্রামেই ছিল ওই গরুর মালিকের বাড়ি। আমরাও হাঁপাতে হাঁপাতে গ্রামের ভেতর ঢুকলাম। একজন গ্রামবাসীর কাছ থেকে মালিকের নাম জেনে গোয়ালে গিয়ে দেখি গরুটি দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দিকে আড় চোখে তাকাল। গরুটি আসতে চায় না। তাকে আসতে হলো তিব্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও। কোনো গরু তার আপন ঠিকানা ছাড়তে চায় না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- কোরবানির পশু