‘শত্রু-শত্রু’ খেলার দুষ্টচক্রে বাংলাদেশ

বিডি নিউজ ২৪ মো. ইমরান হোসেন ভূঁইয়া প্রকাশিত: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:৪২

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ নিয়ে বেশ আগ্রহী! সবকিছুতেই তারা ষড়যন্ত্র খুঁজে পায় এবং প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সেই ‘তাত্ত্বিক শত্রু’র ওপর সব দোষ চাপিয়ে শান্তি পায়! তারা নিজেরা ইতিবাচক ও সৃজনশীল কাজ করবে না, ভালো কাজের কোনো প্রতিযোগিতা করবে না; তবে সারাদিন অন্যের দোষ খুঁজে বেড়িয়ে আর একে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে ব্যস্ত থাকবে! এই চর্চা আমাদের ব্যক্তিজীবন থেকে জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হয়। তাই তো এই দেশে যেমন জনগণ তেমন নেতা, আবার যেমন নেতা তেমন জনগণ! এই দেশে আইন-বিচার বলতে কিছু নেই, নাগরিক অধিকার বলতে কিছু নেই; কিন্তু দোষারোপের রাজনীতি আছে শতভাগ। এই দল বলবে, ওই দলের জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা আর উন্নয়ন রসাতলে গেল; আর ওই দল দিবে এই দলের দায়, কিন্তু কেউই এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করবে না।


জনগণও এ দেশে এক মহাসার্কাসের পাপেট বটে! কোনো দিন প্রশ্ন করবে না যে, “দেশের মালিক জনগণ হলে আমার নাগরিক অধিকার কই, আমার ন্যায়বিচার কই, আমার আইনের চোখে সমান অধিকার কই!” এই প্রশ্ন না সে নিজের দলের নেতাদের করতে পারবে, না করতে পারবে রাষ্ট্রকে। নিজেদের একেকজন মহান জ্ঞানী আর রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভাবা এই দেশের লোকদের নিজের রাজনৈতিক অধিকারটাও কেন জানা নেই, তা এক প্যারাডক্স বটে!


এই দেশের মানুষ নিজেরা পড়াশোনা করবে না, জ্ঞান অন্বেষণ করার চেষ্টা করবে না; কিন্তু ধর্ম বা রাজনৈতিক বয়ান শুনবে অর্ধশিক্ষিত বা ‘অতিশিক্ষিত’ ও মতলববাজ ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক পীরদের কাছ থেকে, যারা উপার্জনের নিমিত্তে বক্তৃতা বা ইউটিউব ভিডিওতে নানান রকম ছবক দিয়ে বেড়ান! বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব বক্তব্য আর ভিডিওর মধ্যে কোনো না কোনোভাবে অন্যান্য ধর্ম, বর্ণ, দল বা দেশের বিপক্ষে একপাক্ষিক বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার ব্যাপারে মিল পাওয়া যায়। যেহেতু এ দেশে বেশিরভাগ মানুষের নিজস্ব কোনো চিন্তা নেই, তাই তারা এসব ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বেশ প্রভাবিত হয় বলে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ এদিক-ওদিক শুনে ধার করা জ্ঞান ও কথাবার্তা নিয়েই আবার তারা জ্ঞানী সাজার ভান করে থাকে!


এখানে ধর্ম বলেন আর রাজনীতি বলেন, বেশিরভাগ জায়গাতেই মানুষজন একমুখী চিন্তা করতে অভ্যস্ত। মুক্তচিন্তা বা যুক্তিতর্ক এখানে সুদূরপরাহত! জাতীয়ভাবে নিজেদের এমন জ্ঞানচর্চার অবস্থা হওয়া সত্ত্বেও তারা আবার সারাদিন নিজেদের উপমহাদেশে, বা কখনো কখনো বিশ্বদরবারে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। সেখানে আবার শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে না পারার পেছনেও নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও উদ্ভাবনী শক্তির বিচার-বিশ্লেষণ না করেই নিজেদের পিছিয়ে পড়ার দোষটা চাপাবে দেশের ও দেশের বাইরের নানান শত্রুর ওপর!


নিজের ভালোটা অবশ্য এই জনপদের মানুষ শতভাগ বোঝে, কিন্তু সামষ্টিক বা সামগ্রিক ভালোটা তাদের শিক্ষাতে নেই! নিজের ভালোটা হলেই মানুষ খুশি—সেটা ক্ষমতার ব্যবহার বা অপব্যবহার যা-ই করেই হোক না কেন! আইন, বিচার বা সরকারি সম্পদ সবই এখানে ব্যক্তি বা দল তার স্বার্থে ব্যবহার করবে, কিন্তু কখনোই গণমানুষের স্বার্থে ব্যবহার করবে না। যেই পুলিশ বিরোধী দলে থাকতে তাদের পেটাল, সরকারি দলে গিয়ে তারা সেই পুলিশকে সংস্কারের মাধ্যমে জনমুখী করার পরিকল্পনা করবে না; বরং নিজেদের স্বার্থে সেই পুলিশকে দ্বিগুণ পেটানোর কাজে লাগাবে। সরকারি সব প্রতিষ্ঠানকেই ক্ষমতায় থাকা দল কুক্ষিগত করে রাখবে, আর বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা ‘সব গেল গেল’ রব তুলবে; কিন্তু ক্ষমতায় গেলে তারাই গিয়ে আবার ওই সব প্রতিষ্ঠান দখল করে নিজেদের ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে কাজে লাগাবে—তবুও সামষ্টিকভাবে জনগণের জন্য কিছু করবে না।


পুলিশ এবং আদালতসহ সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যে কোনো ব্যক্তি বা দলের জন্য নয়, বরং দেশের সমস্ত জনগণের জন্য সমানভাবে কাজ করবে এবং আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ করবে—তা কোনো নেতা বা আপামর জনগণ কেউই বলবে না। ক্ষমতায় থেকে বা ক্ষমতার বাইরে থেকে একে অপরকে দোষারোপ করে যাবে; ক্ষমতায় না থাকলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারা নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হবে, কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ কেউ তৈরি করতে বলবে না। ‘বিচার মানি, কিন্তু তালগাছ আমার’ ঘরানার মানুষজন হয় আজ মার খাবে, নয় কাল মার দেবে; কিন্তু সকলের সমান অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার কাজটা ভুলেও করবে না।


ব্যক্তি বা দল হিসেবে কমবেশি সবাই এখানে গণতান্ত্রিক রাজনীতির চাইতে সুবিধাতান্ত্রিক রাজনীতিটা বেশি চর্চা করে। নিজের বা নিজের দলের কাজ হলে সব ‘ভালো’, আর বিরোধী কারো হলে তা ‘কালো’—মোটাদাগে এই হলো আমাদের গণতন্ত্র! ব্যক্তি পর্যায়ে যেমন তারা যুক্তিতর্ক বা আত্মসমালোচনা বিমুখ, দলীয় বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তাই। জনগণের (প্রশ্নবিদ্ধ) জ্ঞান, স্বার্থান্বেষী নেতা ও নতুন যুগের ডিজিটাল পীরদের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আর দোষারোপের রাজনীতির ওপর ভিত্তি করেই আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে চলতে থাকে ‘শত্রু শত্রু’ খেলা! নিজেরা কী কী করলে দেশের বা দশের ভালো হবে, তা চিন্তা ও বাস্তবায়ন করার চাইতে অবশ্য এই শত্রু-শত্রু খেলাটা সহজ। জনগণও একটা জোশের মধ্যে সারাক্ষণ শত্রুকে নিয়ে অহেতুক আলাপ-আলোচনা আর উত্তেজনায় ব্যস্ত, আর নেতারা এই সুযোগে তাদের ক্ষমতা বা আখের গোছাতে ব্যস্ত—এমন উইন-উইন (বা লুজিং-লুজিং) কম্বিনেশন তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে এই ভূখণ্ডে বেশ কার্যকর বটে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও