মানুষ একই সঙ্গে দুর্লভ ও বিপন্ন এক প্রজাতি
বিজ্ঞান আমাদের শেখায় যে মানববুদ্ধি হলো স্ব-সংশোধনযোগ্য; এর জন্য প্রয়োজন কেবল সহনশীলতা ও নমনীয়তা। মহাবিশ্ব যেমন, তেমন করেই আমাদের তাকে বুঝতে হবে; কোনোভাবে এর কেমন হওয়া উচিত, তার সঙ্গে কতটুকু সাদৃশ্যপূর্ণ—এই ভেবে আমাদের বিভ্রান্ত হওয়া ঠিক হবে না। আমাদের কাছে যা স্পষ্ট বা অনিবার্য মনে হয়, তা প্রায়ই ভুল প্রমাণিত হয়; আবার যা অপ্রত্যাশিত, তা-ই কখনো কখনো সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
পৃথিবী সাড়ে চার শ কোটি বছর বিবর্তনের পর আজকের অবস্থায় উপনীত হয়েছে। অথচ মানুষ কয়েক হাজার বছরের সীমিত পর্যবেক্ষণ নিয়ে নিজেদের ধারণাকে শাশ্বত সত্য বলে ঘোষণা দিচ্ছে! কোনো একক জাতি, ধর্ম বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষে আমাদের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের কাজ হলো, বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বিরাজমান ব্যবস্থার চেয়েও ভালো সামাজিক ব্যবস্থা খুঁজে বের করা এবং সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। এ চেষ্টাই আমাদের টিকে থাকাকে শক্তিশালী করবে।
ইতিহাসে একবারই বিজ্ঞানভিত্তিক সভ্যতার এক অসাধারণ সম্ভাবনাময় উষা দেখা গিয়েছিল। আয়োনীয় জাগরণের উত্তরসূরি হিসেবে আলেক্সান্দ্রিয়া গ্রন্থাগারে অবস্থান নিয়েছিলেন দুই হাজার বছর আগে প্রাচীন যুগের শ্রেষ্ঠ মনীষীরা। সেখানে তাঁরা গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাহিত্য, ভূগোল এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের পদ্ধতিগত অধ্যয়নের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। দুঃখজনকভাবে, সেই গৌরবময় গ্রন্থাগারের ৫ লাখ স্ক্রলের একটিও আজ অবশিষ্ট নেই। সবই জ্বলে-পুড়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে, কালের ঝাপটায় হারিয়ে গেছে। আজও আমরা সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছি। তবু অতীত থেকে আগত লাখ লাখ সুতো বুননে তৈরি হয়ে চলেছে আধুনিক বিশ্বের শিকলের মালা।
প্রাচীন ধসে যাওয়া আলেক্সান্দ্রিয়া গ্রন্থাগারের সন্নিকটে আজও মস্তকবিহীন স্ফিংস (প্রাচীন মিসরীয় ও গ্রিক পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে সিংহের শরীর এবং মানুষের মুখবিশিষ্ট একটি পৌরাণিক প্রাণী) বর্তমান। এটি আলেকজান্ডারেরও এক হাজার বছর আগে, অষ্টাদশ রাজবংশের ফারাও হোরেমহেবের সময়ে ভাস্কর্যরূপে নির্মাণ করা হয়েছিল। ওই সিংহসাদৃশ অবয়ব থেকে সহজেই চোখে পড়ে অনতিদূরে থাকা একটি আধুনিক মাইক্রোওয়েভ রিলে টাওয়ার দাঁড়িয়ে আছে। মানবপ্রজাতির ইতিহাসে তাদের মধ্যে অবিচ্ছিন্ন এক সর্পিল যোগসূত্র বিরাজমান রয়েছে। তারপরও সাহস ও বুদ্ধিমত্তার মধ্য দিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে ওই বিক্ষিপ্ত পথের স্বল্প কিছু আভাস অর্জন করেছি যে পথ বরাবর আমাদের পূর্বপুরুষেরা হেঁটে গেছেন এবং আমরাও হেঁটে চলেছি।
বিগত ৪০ হাজার প্রজন্মের কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে আমাদের অর্জনগুলো দাঁড়িয়ে আছে, অতি ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া তাদের বেশির ভাগের কথাই আমরা জানি না। আমরা কখনো কখনো হাতড়ে মরি বা বিভ্রান্তিতে পড়ি ওই সব বড় সভ্যতাকে নিয়ে। যেমন এবলার প্রাচীন সমাজ, যারা উন্নতি লাভ করেছিল মাত্র স্বল্প কয়েক হাজার বছর আগে। যে সমাজ সম্পর্কে আমরা প্রায় কিছুই জানি না। আমরা আমাদের নিজেদের অতীত সম্পর্কে কতই না অজ্ঞ! অন্তর্লিখন, প্যাপিরাস, বই মানবপ্রজাতিকে সময়ের বন্ধনে বেঁধে রাখে। এ নথিগুলো আমাদের পূর্বসূরিদের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শুনতে সাহায্য করে। আমরা চিনতে পারার আনন্দে অভিভূত হই, যখন আমরা অনুভব করি তারা কতই না আমাদের মতো ছিল!
কার্ল সাগান তাঁর ‘কসমস’ গ্রন্থে বলেছেন, আমরা একান্তভাবে মনোযোগ দিয়েছি আমাদের পূর্বপুরুষদের কয়েকজনের প্রতি, যাঁদের নাম হারিয়ে যায়নি—ইরাটোস্থেনিস, ডেমোক্রিটাস, অ্যারিস্টার্কাস, হাইপেশিয়া, লিওনার্দো, কেপলার, নিউটন, হাইজেনস, শাপোলিয়, হুমাসন, গডার্ড, আইনস্টাইন—সবাই প্রায় পশ্চিমা সংস্কৃতি থেকে আগত। কেননা, আমাদের গ্রহে সদ্য উদ্ভবরত বিজ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা হলো মূলত একটি পশ্চিমা সভ্যতা। কিন্তু প্রত্যেক সংস্কৃতি—চীন, ভারত, পশ্চিম আফ্রিকা, মেসোআমেরিকা—আমাদের বিশ্ব সংস্কৃতিতে তাদের বিশাল অবদান রয়েছে এবং তাদেরও ছিল প্রথম দিকের প্রভাব বিস্তারি চিন্তাবিদেরা।