‘ধর্ষণ ব্যাধি’ থেকে আরোগ্যের ওষুধ কী?
একজন কিশোরী, যে দুই সপ্তাহ আগে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাকে যখন ধর্ষকরা তার বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল, তখন তার মনের অবস্থা কেমন ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর সবার অনুমেয়। ভয়ে নিশ্চয়ই মেয়েটির পিলে চমকে উঠেছিল। তার ওপর ফের পাশবিক নির্যাতন চলবে—হয়তো এটা সে বুঝেই গিয়েছিল। কিন্তু তার করার কিছুই ছিল না। হয়তো বাঁচার জন্য সে ধর্ষকদের হাঁতে-পায়ে ধরেছিল। ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুনয়-বিনয় করেছিল।
বলছিলাম নরসিংদীর মাধবদী উপজেলায় দলবদ্ধ ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার আমেনা আক্তারের (১৫) কথা। ২৬ ফেব্রুয়ারি সেখানকার একটি সরিষা ক্ষেত থেকে গলায় ওড়না প্যাঁচানো তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
পেট বাঁচাতে এসে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার এই পোশাক শ্রমিক সম্ভ্রম হারালেন। প্রাণটাও হারালেন। তার এই হত্যা-ধর্ষণ কথিত সভ্য সমাজের গায়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করল। পুরো মানবজাতির গায়ে যেন কলঙ্কের দাগ লাগল। এই দাগ তোলার কেমিকেল কী? নেই। এই দাগ কখনো যাবে না। লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ প্রশাসন, সুশীল সমাজ, বিভিন্ন সংগঠন নড়েচড়ে বসেছে। প্রধান অভিযুক্ত নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরাসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দোষীদের শাস্তি দাবিতে কয়েকটি সংগঠনের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। বিচারও হবে। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া শেষ হতে কতদিন লাগে—সেটাই বড় কথা।
প্রেমের নামে ফাঁদ, ধর্ষণ ও হত্যা: মামলায় আমেনার মা ফাহিমা বেগম গুরুতর অভিযোগ করেছেন। মেয়েটিকে আসলে প্রেমের ফাঁদে ফেলেছিল নূরা। মামলায় তিনি অভিযোগ করেছেন তার মেয়ের সঙ্গে নূরার ‘প্রেমের সম্পর্ক’ গড়ে ওঠে। তাকে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে নিজের বাসায় নিয়ে যেত নূরা। ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে ‘পরিবারের অগোচরে ফুসলিয়ে’ তার মেয়েকে মহিষাসুরা ইউনিয়নের কোতোয়ালিরচর হোসেন বাজারে চৈতি টেক্সটাইল মিলের পেছনে নিয়ে যায় সে। সেখানে আগে থেকেই এবাদুল্লাহ (৪০), হযরত আলী (৪০), গাফফারসহ (৩৭) কয়েকজন ছিল। তারা দলবেঁধে কিশোরীকে ধর্ষণ করে এবং ঘটনা কাউকে না জানানোর জন্য হুমকি দেয়। মেয়েটি ঘটনাটি পরিবারকে জানায়নি। কিন্তু ঘটনাটি চাপাও থাকেনি। স্থানীয়রা বিষয়টি জেনে যায়। তাদের একজনের কাছ থেকে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন মা। পরে মেয়েটি ঘটনা স্বীকার করে।
মা ফাহিমার অভিযোগ, সাবেক ইউপি সদস্য ও বিএনপি নেতা আহাম্মদ দেওয়ান বাড়ি এসে তাকে বলেন—বিষয়টি পুলিশকে জানানো যাবে না। তারাই এর বিচার করবেন। কিন্তু আসামিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ধর্ষণের কোনো বিচার না করে তারা বাদীর (মেয়েটির মা) পরিবারকে এলাকা ছেড়ে যেতে বলেন। এরপরও তারা এলাকায় ছিলেন। এতে আসামিরা ক্ষুব্ধ হন। বাদী আতঙ্কের মধ্যে মেয়েকে তার বোনের বাসায় পাঠানোর চিন্তা করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে বাদীর স্বামী, মেয়েটির সৎ বাবা কিশোরী মেয়েকে নিয়ে রওনা হন। কোতোয়ালীরচর বড়ইতলার তিন রাস্তার মোড়ে পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে কয়েকজন তাদের পথরোধ করে। তখন নূরা বিয়ে করার কথা বলে কিশোরীকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। কিশোরীর বাবা প্রতিবাদ করলেও তারা শোনেনি। কিশোরীকে তারা মাঠের প্রান্তের দিকে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় কিশোরীর মা নয় জনকে আসামি করে মামলা করেন। আসামিদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই সমাজ, এই দেশ যে নারীদের জন্য নিরাপদ না—তা আবারও প্রমাণ হলো নরসিংদীর মাধবদীর ওই ঘটনায়। আমেনা হত্যা-ধর্ষণ নিয়ে যখন সারাদেশে তোলপাড় চলছে; ঠিক সেই সময়েই পাবনার ঈশ্বরদীতে জমিলা আক্তার (১৫) নামে এক কিশোরীকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে তার দাদি সুফিয়া খাতুনকে (৬৫)। ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর উত্তরপাড়া গ্রাম থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছেন ঈশ্বরদী থানার ওসি মো. মমিনুজ্জামান।
স্থানীয়দের ধারণা—নাতনিকে তুলে নিতে বাধা দেওয়ায় কুপিয়ে খুন করা হয় বৃদ্ধাকে। আর ধর্ষণ শেষে মেয়েটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হয় সরিষা ক্ষেতে। এসব ঘটনা কিছুদিন আমাদের মনে থাকবে।
এরপর আরেকটি ঘটনা ঘটলে এগুলো বেমালুম ভুলে যাব। এই কষ্ট-যন্ত্রণা বয়ে বেড়াবে কেবল ভুক্তভোগী এবং তার পরিবার।
দ্রুত বিচার, শাস্তি নিশ্চিত হোক: মাগুরার শিশু আছিয়ার কথা মনে আছে? গত বছরের ৬ মার্চ বোনের শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় আট বছরের মেয়েটি। ৮ মার্চ শিশুটির মা মাগুরা সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়। পৈশাচিক ঘটনাটি সারাদেশকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দেয়। বিচারের দাবিতে সোচ্চার মানুষগুলো ক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন করেন তারা। অভিযুক্তদের বাড়িতে আগুন দেয় জনতা। অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে অতিদ্রুত এই মামলার বিচার শেষ করার আশ্বাস দেওয়া হয়। ১৩ মে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতের বিচারক এম জাহিদ হাসান রায় ঘোষণা করেন। মেয়েটির বোনের শ্বশুর হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্যে দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। গত ২৭ এপ্রিল মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। ছুটির দিন বাদে টানা শুনানি চলেছে। আছিয়া ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডের মতো আমেনা-জমিলা ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডের বিচারও দ্রুত শেষ হোক। ২১ দিন নয়, সম্ভব হলে আরও আগে এই দুই মামলার বিচার কাজ শেষ করা হোক। শুধু রায় দিলেই হবে না। রায় কার্যকর করতে হবে। আছিয়ার ধর্ষক-খুনি হিটু শেখের সাজা কার্যকর হয়নি এখনো। কবে কার্যকর হবে, তাও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সংঘবদ্ধ ধর্ষণ