নদীকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ করা জরুরি

বণিক বার্তা মুহাম্মদ মনির হোসেন প্রকাশিত: ০১ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৪

বাংলাদেশ মূলত সক্রিয় বদ্বীপ (অ্যাকক্টিভ ডেল্টা)। এখানে প্রকৃতিই শ্রেষ্ঠ স্থপতি। এ ভূখণ্ডের প্রতিটি ধূলিকণাই নদীর পলি দিয়ে গঠিত। শত শত নদীর অবদানেই এ ভূখণ্ড হয়েছে বৈচিত্র্যময়। হিমালয় বেয়ে নামা বিভিন্ন জলধারা এ সমতল ভূমিকে করেছে সজল, শস্য সুফলা ও উর্বর। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের মতো বিশাল বিশাল সব নদী আমাদের মানচিত্রের প্রধান কারিগর। এজন্য নদী এখানে কেবল ভূপ্রকৃতির অংশ নয়, এটি দেশের মানুষের জীবনপ্রবাহও। নদীর কাজ হলো পলি বহন করা এবং মাটিকে নতুন করে প্রাণ দেয়া। বর্ষায় নদী প্লাবন ভূমিকে যে পুষ্টি দেয়, তা আমাদের কৃষির প্রধান শক্তি। এখানে কৃষকের লাঙল আর নদীর জল মিলেমিশেই অন্নের সংস্থান হয় কোটি কোটি মানুষের। আবার নদীর জোয়ার-ভাটা উপকূলীয় অঞ্চলের ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে নিরন্তর। প্রাচীনকাল থেকে নদীপথেই এ দেশে স্বল্পমূল্যে পণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে। ফলে নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এ দেশের বড় বড় শহর ও বাণিজ্য কেন্দ্র। নদী বাংলাদেশের মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণের বড় একটি উৎস। দেশের অনেক পরিবার সরাসরি নদী উৎসের আয়ের ওপর নির্ভর করে। শুধু জীবিকাই নয়, নদী মিশে আছে এখানকার মানুষের সংস্কৃতি ও জীবনাদর্শনের গভীরেও। ভাটিয়ালি আর মুর্শিদি গান নদীর ঢেউয়ের ছন্দেই প্রাণ খুঁজে পায়। নদী মিশে আছে আমাদের সামগ্রিক জাতীয় জীবনে।


দুঃখজনক হলেও সত্য, এ নদীর অবদানকেই যেন আমরা অস্বীকার করছি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে নদীদূষণ। নদী দখল করে অবৈধ স্থাপনা ও কলকারখানা নির্মিত হচ্ছে। অভিযোগ আছে, একটি অসাধু মহল রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ পন্থায় বালি উত্তোলন করছে। এভাবে নদী হারাচ্ছে নাব্যতা এবং প্রায়ই গতি পরিবর্তিত হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিচ্ছে তীব্র পানির সংকট। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা তথা বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় তীরবর্তী স্থানে ভাঙন ধরছে। নদীভাঙনের ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন ও নিঃস্ব হচ্ছে। নদীদূষণের ফলে সৃষ্ট পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা জলবায়ু পরিবর্তনকেই ত্বরান্বিত করছে। বাস্তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে এসব রোধ করা কঠিন কিছু নয়। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের প্রতি কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ ও কার্যক্রম প্রত্যাশিত।


সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে নতুন সরকার। দায়িত্ব নেয়ার পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তনের আশ্বাসও ব্যক্ত করেছে সরকার। এক্ষেত্রে তারা পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়েও বাড়তি মনোযোগ দেবেন, এমনটিই প্রত্যাশিত। জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে নদীকে বাঁচাতে হবে। শুধু জাতীয় নিরাপত্তার অংশ বলে ঘোষণা দিলেই সমাধান হবে না। এজন্য সরকারকে দৃশ্যমান সব পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এ মুহূর্তে অর্থনৈতিক বাস্তবতা চিন্তা করে অনেকেই হয়তো এ প্রস্তাবনার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারছেন না। কিন্তু যদি আমরা একটু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বিচার করি, তাহলে সমস্যাটুকু অনুধাবন করতে পারব। ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালত নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এ স্বীকৃতি দেয়ার পরও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব থাকায় আমরা নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করতে পারছি না। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই পর্যাপ্ত নয়। প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার বিষয়েও চাই বাড়তি মনোযোগ। যেকোনো কল্যাণমুখী সরকারের জন্য প্রাকৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষার বিষয়ে বাড়তি মনোযোগ প্রত্যাশিত। অবকাঠামোগত উন্নয়ন যখন প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে নষ্ট কিংবা বাধাগ্রস্ত করে তখন তা আশীর্বাদের বদলে অভিশাপই হয়ে ওঠে। কারণ প্রকৃতির সঙ্গে জনজীবনের রয়েছে নিবিড় যোগ। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীর স্বার্থরক্ষা এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ।


নদীহীন উন্নয়ন টেকসই নয়। উন্নয়ন মানে অনেকেই কেবল ইট-পাথরের অট্টালিকা বা বিশাল চওড়া পিচঢালা রাস্তা বোঝেন হয়তো। অথচ প্রকৃত উন্নয়ন হলো মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, যা প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ, যেখানে নদীর স্পন্দনই হলো এ দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি। তাই নদীকে মেরে ফেলে বা তার গতিপথ রুদ্ধ করে যে অবকাঠামো গড়া হয়, তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মনে রাখতে হবে, নদী না থাকলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়, যা ভবিষ্যতে তীব্র পানির সংকট তৈরি করে। আবার পানির অভাব দেখা দিলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং শিল্প-কারখানাও অচল হয়ে পড়ে। নদীহীন উন্নয়নে বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যায়, ফলে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হয়। শহরাঞ্চলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়া নদী ও খাল দখলেরই একটি অশুভ ফল।


আধুনিক বাস্তবতায় অনেকেই মনে করেন, সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে নৌপথকে শক্তিশালী করাই হলো টেকসই উন্নয়নের লক্ষণ। বাংলাদেশ সরকারকেও এ সত্য অনুধাবন করতে হবে। তার মানে এই নয় যে সড়ক খাত উন্নত হবে না। কিন্তু সেটিও যেন করা হয় নিয়ম মেনে, পরিবেশগত সমীক্ষা শেষে। মনে রাখতে হবে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনে নদী ও জলাশয় রক্ষা করা একটি প্রধান শর্ত। কারণ নদী নাব্যতা হারালে কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনমুখী অনেক শিল্পের কাঁচামাল সংকট দেখা দেবে। খাদ্য ও উৎপাদন নিরাপত্তার স্বার্থেই নদীকে রক্ষা করতে হবে। দেশে নদী রক্ষার জন্য সমন্বিত সরকারি পরিকল্পনা ও সর্বদলীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিকল্প নেই। শুধু নীতিগত অবস্থান নয়, মাঠপর্যায়ের কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাও এখানে অপরিসীম। নদীরক্ষায় সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রতিটি নদী ও তার গতিপথের ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করতে হবে। নদীর সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব এড়ানোর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও জরুরি। বিশেষত জাতীয় বাজেটে সবসময় পরিবেশ ও নদী সংরক্ষণের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে।


আমরা জানি, নদী মরে যাওয়ার পেছনে অবৈধ পন্থায় বালি উত্তোলন একটি বড় সমস্যা। নদীতে যেন কোনোভাবেই অবৈধ পন্থায় বালি উত্তোলন কেউ না করতে পারে, সেজন্য তদারকি বাড়াতে হবে। এজন্য বিশেষায়িত তদারকি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। নদী দখলের পাশাপাশি দূষণও একটি বড় সমস্যা। নদীর দূষণ রোধে প্রতিটি শিল্পাঞ্চলে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা জরুরি। এক ফোটা বিষাক্ত বর্জ্যও যেন নদীতে না মেশে, এ বিষয়ে সব পক্ষকে সজাগ থাকতে হবে। নদী তীরবর্তী অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে সেখানে সবুজবেষ্টনী গড়ে তোলার বিষয়েও আলাদা করে ভাবতে হবে। মানুষকে নদীর সঙ্গে সম্পৃক্ত করার জন্য প্রাকৃতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। তীরের পাশে ফুটওয়াক নির্মাণ করলে অনেকের জন্য নদীর আশপাশের প্রকৃতি বিনোদনের কেন্দ্র হয়ে উঠবে। এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে নদীর সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা বাড়বে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও