দম্ভ নয়, সেবার মানসিকতাই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার মূলমন্ত্র
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের জনগণ তাদের রায়ের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে একটি 'নতুন বাংলাদেশ' গড়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির নতুন সরকার যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, তখন তাদের সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি রয়েছে কোটি মানুষের বিশাল প্রত্যাশা।
সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধীদলের কার্যকর ভূমিকা দেখতে চায় মানুষজন। সংসদীয় গণতন্ত্রে তারা ছায়া সরকারের ভূমিকা পালন করে। গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকারি দলকেও বিরোধীদলের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ পরিহার করে সহনশীল আচরণ করতে হবে।
গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত বিএনপির নির্বাচনোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে কিছুটা আঁচ পাওয়া গেছে।
ওই সংবাদ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ভবিষ্যতে আর কেউ যেন স্বৈরাচার হয়ে উঠতে না পারে এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় এবং তাৎক্ষণিক প্রত্যাশা হলো দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের উপরে থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ দিশেহারা। তাই নিত্যপণ্যের দাম কমানো, সিন্ডিকেট দমন এবং বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করা নতুন সরকারের জন্য হবে প্রথম পরীক্ষা। একইসাথে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল করার দাবি এখন সর্বজনীন।
দশকব্যাপী দুঃশাসনের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ এখন চায় একটি জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং পেশিশক্তির রাজনীতি চিরতরে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধ করা জরুরি। 'যার কাজ তার কাছে'—এই নীতিতে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং পদোন্নতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার প্রত্যাশা এখন প্রবল।
নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সহিংসতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি রোধ করা নতুন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষ একটি শান্তিময় পরিবেশ চায় যেখানে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং সাধারণ নাগরিকরা নির্ভয়ে তাদের মত প্রকাশ করতে পারবে। মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনি রোধ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে 'মব কালচার' বা আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা। বিচারবহির্ভূত এই সহিংসতা শুধু মানবাধিকারেরই লঙ্ঘন নয়, বরং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকেও চ্যালেঞ্জ করে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নতুন সরকার মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করবে। গুজব ছড়িয়ে উসকানিদাতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা এবং প্রতিটি ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশ পুলিশ-কে পেশাদারিত্বের সাথে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সক্ষমতা অর্জন করতে হবে, যাতে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখতে পারে। আইনের শাসনের প্রকৃত স্বাদ পেতে হলে রাজপথের বিচার বন্ধ করে আদালত ও আইনি প্রক্রিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করাই হবে নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
অধিকাংশ মব ভায়োলেন্স শুরু হয় সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব থেকে। সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি (BTRC)-কে সক্রিয় থেকে ফ্যাক্ট-চেকিং জোরদার করতে হবে এবং উসকানিমূলক পোস্টদাতাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- রাষ্ট্র পরিচালনা
- জুলাই বিপ্লব