বুলবুলের ঘুড়ির নিচে বাংলাদেশের ক্রিকেট
বাংলা অভিধান অনুযায়ী ‘গোল্লা’ শব্দটির অর্থ শূন্য। তুচ্ছার্থে পরীক্ষায় খুব খারাপ ফল করা বোঝাতে ‘গোল্লা’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা যাই হোক না কেন—বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বর্জন একটি আত্মঘাতী, অর্বাচীন ও অধিকতর ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত। যে সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান কুশীলব বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বর্জনের বেদনাদায়ক আখ্যানের শেষ অঙ্কে বুলবুল সাহেব লাহোর সফরে গিয়েছিলেন। মধ্যরাতে ডাক পেয়ে পাকিস্তানে উড়ে গিয়ে তিনি ঘুড়ি উড়িয়েছেন। ঘুড়ি উড়ানো দোষের কিছু নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেট যখন আইসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আমাদের বোর্ড সভাপতি লাহোরের আকাশে রঙিন ঘুড়ি উড়িয়ে উদ্যাপন করছেন। ভিডিওতে তার ৩২ পাটি দাঁতের যে ঝকঝকে প্রদর্শনী দেখা গেল, তাতে মনে হতেই পারে—দেশের ক্রিকেটের ভরাডুবি বোধহয় স্রেফ একটি কৌতুক।
সভাপতির দাবি, তিনি অতি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের পক্ষে দূতিয়ালি করেছেন। তারপর দেশে ফিরে পত্রপত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন, ক্রিকেট কূটনীতিতে আমরা গোল্ড মেডেল পাওয়ার যোগ্য।
তো, ক্রিকেট কূটনীতিতে বাংলাদেশের স্বর্ণপদক পাওয়ার দৃশ্যমান ফলাফল কী? বাংলাদেশ কি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ফিরল? বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের টাকা (পার্টিসিপেশন ফি) বা ম্যাচ ফি পেল, নাকি ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে খেলতে বাধ্য হওয়া পাকিস্তানের দাবার ঘুঁটি হলো? হ্যাঁ, লাহোরের ওই বৈঠকের পর আইসিসি বলেছে, তারা বাংলাদেশকে কোনো শাস্তি দেবে না। তো অর্বাচীন, আবেগী সিদ্ধান্ত নিয়ে শাস্তির মুখে পতিত হয়ে সেখান থেকে রক্ষা পাওয়া কি বিরাট বিজয়, নাকি আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের পর লজ্জাজনক আত্মসমর্পণ?
ক্রিকেট দুনিয়ার হালহকিকত নিয়ে যারা সামান্য খোঁজখবর রাখেন, তারা জানেন পাকিস্তানের পক্ষে বিশ্বকাপ বয়কট কিংবা ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলা কতটা অবাস্তব ও অকল্পনীয় বিষয়। তার চেয়ে বড় কথা বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তানের বিশ্বকাপ বর্জনের কোনো যুক্তি নেই। কারণ, ভারত-শ্রীলঙ্কার এই বিশ্বকাপে তারা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য মাঠে নামছে। চেনা কন্ডিশনে তাদের শিরোপা জেতার সম্ভাবনাও রয়েছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তান একবার চ্যাম্পিয়ন (২০০৯) ও দুবার রানার আপ (২০০৭, ২০২২) হয়েছে। ওই পাকিস্তান বাংলাদেশের জন্য বিশ্বকাপ বর্জন করবে! চরম অর্থ সংকটে থাকা পাকিস্তান ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জন করবে—কার জন্য, বাংলাদেশের জন্য! এ কথাও বিশ্বাস করতে হবে আমাদের? হ্যাঁ, রাজনৈতিক অঙ্ক মেলাতে ব্যস্ত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার, অন্তত একজন উগ্রবাদী উপদেষ্টা ও ক্রিকেট স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া বিসিবি হয়তো ভেবেছিলেন, পাকিস্তানের বয়কট নাটক ও ভারত বিরোধিতার জুজুতে তারা অনেক কিছু অর্জন করবেন। তো, কী কী অর্জিত হলো? পাকিস্তান বিশ্বকাপ খেলছে, ভারতের বিপক্ষেও মাঠে নামছে পূর্ণোদ্যমে।
একটা সহজ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বর্জনে ভারতের কী ক্ষতি হলো? না, ভারতের কোনো দৃশ্যমান ক্ষতিই হয়নি। ভারত ভারতের জায়গাতে আছে, পাকিস্তানও পাকিস্তানের জায়গাতেই। শুধু বিশ্বমঞ্চে নেই বাংলাদেশ। বিশ্বকাপের রণাঙ্গনে নেপাল, ইতালি, জিম্বাবুয়ের মতো দল যেখানে পুরো দেশকে আনন্দে মাতোয়ারা করছে, তখন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা ঘরের কোণে বসে টিভিতে চোখ রাখছেন।
একবার চিন্তা করুন তো বাংলাদেশে একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। চারদিকে আশাবাদী উদ্দীপনা। নৈরাজ্যের বিপরীতে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার আহ্বান বিভিন্ন পক্ষ থেকে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপে মোস্তাফিজ-রিশাদরা যদি কোনো বড় দলকে হারিয়ে দিত, ভারত-পাকিস্তানের কাউকে হারিয়ে দিত, তবে দেশে কী পরিমাণ আনন্দের বন্যা বয়ে যেত! কী ধরনের উদ্দীপনায় ও নির্মল আনন্দে ভেসে যেত দেশ। মনে করিয়ে দিই, জিম্বাবুয়ের মতো পুচকে দল পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়াকে এরই মধ্যে হারিয়ে দিয়েছে। আর এশিয়ার চেনা কন্ডিশনে আমাদের ভালো করার সুযোগও তো আরও বেশি ছিল।