সন্তান পালন নারীর কাজ—এই মিথ ভাঙার সময় এসেছে
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে সদ্য পিতৃত্বের স্বাদ পাওয়া দুজন বাংলাদেশি তরুণ প্রকৌশলী এক ডিনারে স্ট্রলার ঠেলতে ঠেলতে হাজির। দুই স্ট্রলারে দুটো গুবলু–গাবলু বাচ্চা মহা আরামে চুষনি মুখে ‘গবেষকের’ দৃষ্টিতে চারপাশ দেখছিল।
প্রথম তরুণ রীতিমতো অবাক হয়ে দ্বিতীয় তরুণকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কীভাবে তোমার এমন চেকনাই বাড়ল? দেখে তো ঈর্ষা হচ্ছে হে। তুমি রাত জাগো না বাবুর জন্য?’
দ্বিতীয় তরুণ বললেন, ‘বন্ডিং লিভ পেয়েছিলাম। তা ছাড়া আমার শাশুড়ি আসাতে দিনে একটু ঘুমাতে পেরেছি কদিন, তাই বোধ হয়...।’
প্রথম তরুণ তাঁর নিদারুণ অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছিলেন। তাঁর সন্তান যখন মাস চারেকের, তখন তাঁর বড় আপা গিয়েছিলেন দেশ থেকে বাচ্চাটিকে দেখার জন্য।
এক রাতে বড় আপা দেখেন, সদ্য বাবা হওয়া তাঁর ভাইটি বুকের সামনে দুহাত ভাঁজ করে (ছোট বাচ্চাকে যেভাবে বুকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঘুম পাড়ানো হয়) চোখ বন্ধ করে সারা ড্রয়িংরুম হেঁটে বেড়াচ্ছে। আপা তাঁকে একটু ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কিরে এভাবে হাঁটছিস কেন?’ সে চোখ বন্ধ করেই জবাব দিল, ‘দেখছ না বাবুকে ঘুম পাড়াচ্ছি।’ আপা বললেন, ‘বাবু কই?’
আমাদের দেশে খুব তরুণ ও আধুনিক বোধসম্পন্ন কর্মজীবী দম্পতি এখন সে রকম কো-প্যারেন্টিং শুরু করেছেন কি না, জানি না। তবে আশি–নব্বইয়ের দশকে আমরা যাঁরা কর্মজীবী নারীরা মা হয়েছি, তাঁরা ‘সন্তান ধারণ ও পালন নারীরই কাজ’ মাইন্ডসেট নিয়ে উদয়াস্ত ঘরে-বাইরে পরিশ্রম করেছি।
তখনো আমাদের মস্তিষ্কে আমাদের গৃহবধূ মা-ফুফু-খালা-চাচিরা রাজত্ব করছিলেন, যাঁরা স্বপ্নেও ভাবেননি— নবজাতকের মুখে দুধের ফিডারটা পর্যন্ত তাঁদের স্বামীরা ধরতে পারেন, নেংটি পাল্টানো তো দূর কি বাত। কিন্তু আশির দশকের কর্মজীবী মা-বাবার সন্তানেরা যাঁরা এখন তরুণ কর্মজীবী পিতা-মাতা, তাঁদের চিন্তাভাবনার বিস্তর পরিবর্তন হয়েছে। উচ্চশিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, বৈশ্বিক যোগাযোগ, জেন্ডার ভারসাম্য, সমবেদনা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ, সময়ানুবর্তিতা ইত্যাদির সমন্বয়ে পুরোনো ধ্যানধারণা থেকে তাঁরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বেরিয়ে আসছেন।
সহমর্মী সঙ্গী বাছাইয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে সন্তান প্রতিপালনে যৌথ উদ্দীপনা কাজ করছে। এক তরুণ সদ্য পিতা বলছিলেন, ‘সন্তান ধারণ করার পর থেকেই আমি আমার স্ত্রীকে দেখেছি—সে প্রতিদিন কী অবর্ণনীয় কষ্ট করেছে! সারা দিন অফিস করে আসার পর একটা কিছু খেয়েই বমি করেছে।
পেটে সন্তান বেড়ে ওঠার সময় কত শারীরিক পরিবর্তন ও জটিলতা দেখা দিয়েছে। জন্মদানের আগের দু–তিন মাস স্ফীত উদর নিয়ে সারা রাত না ঘুমিয়ে ব্যথায় এপাশ-ওপাশ করেছে। আর বাচ্চা জন্মদানের সময়টা তো বর্ণনাতীত। এসব দেখে ও অনুভব করে বাবু আসার পর আমার স্ত্রীকে যাতে আর কষ্ট না করতে হয়, তার জন্য আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করি।’
জন্মের পর শিশুকে স্তন্যদান করতে হয় মাকেই। দিনে–রাতে দু–তিন ঘণ্টা পরপর মাকে নিরলসভাবে তা করে যেতে হয়। যদিও জৈব-টেকনোলজির উন্নয়নে মায়েরা পাম্পের সাহায্যে বুকের দুধ ফ্রিজে জমা করে রাখতে পারছেন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য।
উন্নত বিশ্বে অফিসে ‘মাদারস রুম’ আছে যাবতীয় প্রযুক্তিসহ। একটা নির্দিষ্ট ছুটির পর কর্মজীবী মায়েরা বাইরে কাজে যোগদান করেন। যদিও বেশির ভাগ সময় অল্প কিছুদিনের জন্য নানি-দাদিরা নবজাতকের কাছে থাকেন, কিন্তু রাত জাগতে হয় মাকেই। রাত জেগে পরদিন সময়মতো অফিসেও যেতে হয়। একটু ঘুম না হলে অফিসের কাজ করবেন কীভাবে?
তাই বাচ্চার সহমর্মী পিতারা ঘুম পাড়ানো ও পরিষ্কার করার দায়িত্ব পালন করেন। দুজনের আয়ে সংসার চালাতে গেলে দুজনকেই পারস্পরিক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। আমাদের দেশে সরকারিভাবে পিতৃত্বজনিত কোনো ছুটি নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে একে বলে ‘বন্ডিং লিভ’। বাচ্চার সঙ্গে বাবার সম্পর্ক নিবিড় করার জন্য নতুন বাবাকে এই ছুটি দেওয়া হয়। একটা বা বড়জোর দুটোর অধিক বাচ্চা কর্মজীবী মা-বাবা নিতে পারছেন না বলে বাচ্চার প্রতি তাঁদের মনোযোগ ও যত্নও অনেক বেশি থাকে। তাই বলে কি বিশ্বে একক মা–বাবার উদাহরণ নেই? আমাদের দেশে এর পরিসংখ্যান নেই। যুক্তরাষ্ট্রে একক মা ৮০-৮৬ শতাংশ হলে একক বাবা ১৪-২০ শতাংশ।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সন্তান পালন