নব্য-বাস্তববাদের আলোকে চির অশান্ত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পথ
মধ্যপ্রাচ্যের অন্তহীন রক্তক্ষয় ও বারুদের গন্ধমাখা বাতাসের গভীরের রাজনীতিকে, নিও-রিয়ালিজম বা নব্য-বাস্তববাদ বা কাঠামোগত বাস্তববাদের আয়নায় দেখলে এক রূঢ় ও নির্মম সত্যের মুখোমুখি হতে হয়। কেনেথ ওয়াল্টজ মনে করতেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি কোনো আবেগের জায়গা নয়, বরং এটি নিরেট কাঠামো বা সিস্টেমের খেলা।
মধ্যপ্রাচ্য কেন শান্ত হচ্ছে না, তার উত্তর লুকিয়ে আছে এই অঞ্চলের ‘এনার্কিক বা নৈরাজ্যকর’ চরিত্রের মধ্যে। এই ‘নৈরাজ্য’ মানে বিশৃঙ্খলা নয়, বরং এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে দেশগুলোর কোনো অভিভাবক নেই। ফলে প্রতিটি রাষ্ট্রকেই নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেত সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হয়।
নিও-রিয়ালিজমের জনক কেনেথ ওয়াল্টজের থিওরি অব ইন্টারন্যাশনাল পলিটিকস দেখায়, রাষ্ট্রগুলো আসলে এই কাঠামোর হাতের পুতুল। ইসরায়েল যখন গাজা কিংবা লেবাননে হামলা করে, কিংবা ইরান যখন প্রভাববলয় বাড়াতে প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে জ্বালানি ও অস্ত্রের জোগান দেয়, তখন তারা আসলে কেউই এককভাবে দোষী বা নির্দোষ হয় না; তারা কেবল টিকে থাকার এক আদিম ও কাঠামোগত লড়াইয়ে লিপ্ত।
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গটি কেবল মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং এটি ‘রাষ্ট্রহীন এক জনগোষ্ঠীর’ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, যারা এই কাঠামোগত যুদ্ধে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবি এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যের সমীকরণে এক বিশাল অস্থিরতা তৈরি করে রেখেছে। কারণ, তাদের প্রতি জনসমর্থন আঞ্চলিক শক্তিগুলোর জন্য কৌশলগত হাতিয়ার বা ‘লিভারেজ’ হিসেবে কাজ করে।
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে ট্র্যাজিক দিক হলো ‘সিকিউরিটি ডিলেমা বা নিরাপত্তা দ্বিধা।’ কোনো রাষ্ট্র যখন আত্মরক্ষার জন্য শক্তি বাড়ায়, পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলো সেটাকে হুমকি হিসেবে দেখে। ফলে তারাও পাল্লা দিয়ে অস্ত্র কেনে বা জোট বাঁধে। আজকের মধ্যপ্রাচ্যে ঠিক এটাই ঘটছে। ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ইরানকে বাধ্য করছে পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের পথে হাঁটতে কিংবা হিজবুল্লাহর মতো শক্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে।
এই অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙার কোনো সহজ উপায় নেই। কারণ, এখানে বিশ্বাস নয়, ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ বা ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ারই’ শেষ কথা। আগের দিনগুলোতে এই ভারসাম্য কিছুটা বজায় থাকলেও বর্তমানের একমেরু বা অসম মেরুকরণ অঞ্চলকে আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করেছ। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসনের সরাসরি একপক্ষীয় অবস্থান এই ভারসাম্যকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। যখন কোনো পক্ষ অতিমাত্রায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন যুদ্ধের আশঙ্কা বহুগুণ বাড়ে। কারণ, দুর্বল পক্ষ তখন মরিয়া হয়ে ওঠে, আর শক্তিশালী পক্ষ হয় বেপরোয়া।
এরই মধ্যে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রথাগত সংঘাতের পথ ছেড়ে নতুন ধরনের ‘ব্যালেন্সিং’ বা ভারসাম্য রক্ষার কৌশল নিয়েছে। একে বলা হয় ‘ব্যান্ডওয়াগনিং’ বা শক্তিশালী পক্ষে ঝুঁকে পড়া। সংযুক্ত আরব আমিরাত যখন আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে, তখন তারা আসলে আদর্শের চেয়ে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তাকেই বড় করে দেখে। তাদের ভয় ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব। সুতরাং, ইরানকে মোকাবিলা করতে তারা ইসরায়েল ও আমেরিকার ছত্রচ্ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে।
সৌদি আরবও এখন এই একই সমীকরণে দাঁড়িয়ে। তারা একদিকে ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান চায় নিজেদের জনমতের কথা ভেবে, অন্যদিকে বাস্তবতার আলোকে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সামরিক সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে। তাদের কাছে পানি ও তেলের রাজনীতির চেয়েও এখন বড় হয়ে উঠেছে অস্তিত্ব রক্ষা। এ কারণেই সৌদি আরব ক্রমাগত সামরিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
তুরস্কের বিষয়টি এই সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তুরস্ক একটি ‘রাইজিং পাওয়ার’ বা উদীয়মান শক্তি, যারা এই আঞ্চলিক নৈরাজ্যের মধ্যে নিজেদের নিরাপত্তা এবং প্রভাব বজায় রাখতে একাধারে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করছে।
নিও-রিয়ালিস্টিক অ্যাপ্রোচে, কোনো রাষ্ট্র যখন অস্তিত্বের হুমকি দেখে, তখন তারা কেবল নিজ শক্তির ওপর ভরসা করে না, বরং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ‘বাফার জোন’ তৈরি করতে চায়। তুরস্ক ঠিক এটিই করছে। একদিকে তারা ন্যাটোর সদস্য হিসেবে পশ্চিমা সামরিক কাঠামোর অংশ, অন্যদিকে সিরিয়া ও ইরাকে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তারা নিজের দক্ষিণ সীমান্তে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে রেখেছে।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে তুরস্কের অবস্থান কেবল সহমর্মিতা নয়, বরং আরব বিশ্বের নেতৃত্ব দেওয়ার এবং নিজেদের নৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কৌশলগত প্রয়াস। সৌদি আরব যখন একা বেড়ে ওঠার প্রচেষ্টায় এবং আরব আমিরাত যখন ইসরায়েলের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে, তুরস্ক তখন সেই শূন্যস্থানে দাঁড়িয়ে নিজেকে মুসলিম বিশ্বের প্রধান অভিভাবক হিসেবে জাহির করতে চায়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মধ্যপ্রাচ্য সংকট
- ভূরাজনীতি