শ্রম অভিবাসন সম্প্রসারণ সম্ভব নাকি জটিল
প্রবাদ আছে, মানুষ অভ্যাসের দাস। জীবনে কোনো কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে স্বস্তি আর আত্মবিশ্বাস কাজ করে। নতুন কিছু বা পরিবর্তনের মধ্যে অজানার আশঙ্কা হাতছানি দেয়। সেই পরিবর্তনে ভালোমন্দ উভয়ই থাকতে পারে, সেই আশঙ্কা।
আবার পরিবর্তনের সাথে নিজেকে কতটা খাপ খাইয়ে নেওয়া যাবে বা সেটা করতে কতটা বেগ পেতে হবে, সেজন্যেও আশঙ্কা কাজ করে। অন্যদিকে আকর্ষণীয় নতুন জীবনের হাতছানি অনিশ্চিত হলেও মানুষকে সেদিকে ধাবিত করতে উদ্বুদ্ধ করে।
দেশান্তরী মানুষের প্রাথমিক সিদ্ধান্তেও এরকম আশা-নিরাশা, নিশ্চিত-অনিশ্চিত, আকর্ষণ-বিকর্ষণ কাজ করে। দেশান্তর সাময়িক বা স্থায়ী, উভয় ক্ষেত্রেই সেই দোলাচল কাজ করে।
যেমন ধরা যাক, সত্তরের দশকে মধ্যপ্রাচ্যে গমনকারী প্রথম ধাপের অভিবাসী কর্মী। জানা গেছে, সৌদি আরবে কর্মরত কয়েকজন পেশাজীবী বাংলাদেশি প্রথম জানতে পারেন সেখানে বিদেশি কর্মীর চাহিদা আছে। দেশে ও সৌদিতে নিয়োগকর্তা, সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে সমন্বয় করে তারা ধীরে ধীরে খণ্ডকালীন চুক্তির ভিত্তিতে কর্মীদের সৌদি আরব যাওয়ার সুযোগ করে দিতে থাকেন।
সেই সার্থক শ্রম অভিবাসনের জের ধরে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে বেসরকারি খাতে বিগত ৫০ বছর ধরে শ্রম অভিবাসন চলমান। বর্তমানে সারা বিশ্বে বাংলাদেশিদের শ্রম অভিবাসনের ৭৭ শতাংশ হয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়, যার সিংহভাগ সৌদি আরবে। এমনকি সরকারি কোনো চুক্তি না থাকলেও ব্যক্তি ও রিক্রুটিং এজেন্সিদের উদ্যোগে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রম অভিবাসন চলমান।
আবার যদি ইউরোপে ইতালিতে বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতার দিকে তাকাই, সেখানে স্থায়ী অভিবাসনের শুরু আশির দশকের শেষ দিকে। এদের মধ্যে একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকেই ভাগ্য আরও সুপ্রসন্ন করতে বৈধ এবং অবৈধ, দুইভাবেই ইতালি প্রবেশ করে, একটা পর্যায়ে স্থায়ী বাসিন্দার অধিকার পায় এবং পরিবারকেও তাদের কাছে নিয়ে আসে।
ইতালিতে প্রথম বাংলাদেশিদের মধ্যে মাদারীপুর ও শরীয়তপুরের মানুষ ছিল। ৪৫ বছরে এই দুই অঞ্চলের বিরাট অংশের পরিবারের কেউ না কেউ ইতালি, স্পেন বা পর্তুগালে। যেমন পঞ্চাশের দশকে বিলাতে অভিবাসীদের বেশিরভাগ সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ জেলার। এসব দেশে বেশির ভাগ বাংলাদেশি কাছাকাছি এবং দেশের নিজ এলাকার মতো পরিবেশেই থাকেন।
অর্থাৎ স্থায়ী অভিবাসীরা এক জায়গায় থিতু হয়ে থেকে যান এবং দেশের মতো পরিবেশ সৃষ্টি করেন যেন বড় ধরনের আর কোনো পরিবর্তন না আসে জীবনে। আবার অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক কর্মীরাও যে দেশ পরীক্ষিত, চেনা অনেকেই গেছেন, সেখানেই যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের বাইরে খুব কম দেশেই অভিবাসী কর্মী যান, কারণ অচেনা-অজানা দেশে ঝুঁকি নিতে চান না। সেজন্য কাজের ক্ষেত্র বা দেশ বিস্তৃত করা সহজাতভাবে হয় না বা হবে না। বাংলাদেশের মানুষ জন্মস্থান ও পরিবারকেন্দ্রিক এবং সহজাতভাবে অ্যাডভেঞ্চারপ্রবণ নয়, প্রবাস জীবনে চেনা গণ্ডির বাইরে বাধ্য না হলে যেতে নারাজ।
তবে এই কয়েকটি দেশের বাইরেও বাংলাদেশিরা কাজ ও বসতির সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছেন। সেটা বিস্তৃত হয়নি পরিবর্তনের অনীহা থেকে। আবার ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রগামী অভিবাসীদের একটি অংশ বৈধ অভিবাসনের পথ বিসর্জন দিয়ে অন্য নানাভাবে প্রবাসে থাকার বা অনুমতির চেষ্টা করে যান, যা একসময় শুধু প্রত্যাখ্যাত হয় তা না, অন্যদের বৈধ অভিবাসনকেও সন্দেহযুক্ত বা নিরুৎসাহিত করে ফেলেন।
অন্যদিকে দেশের অর্থনীতি ও বেকারত্ব মোকাবিলায় একটি বড় কৌশল হতে পারে শ্রম অভিবাসনের শ্রমের খাত এবং দেশ সম্প্রসারণ। কারণ ৪০-৫০ বছরে সেইসব গুটিকয়েক দেশে লাখ লাখ বাংলাদেশি গেছেন এবং এদের অনেকেই স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসলেও সামগ্রিকভাবে এইসব দেশে বাংলাদেশি অভিবাসীদের সংখ্যা বেড়েছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শ্রম অভিবাসন