এলপি গ্যাসের সংকট একটি সংকেতমাত্র

www.ajkerpatrika.com অরুণ কর্মকার প্রকাশিত: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩১

প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তরল পেট্রোলিয়াম (এলপি) গ্যাসের তীব্র সংকট দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার একটি সংকেত মাত্র। যদিও সব ক্ষেত্রেই জ্বালানির ঘাটতি দীর্ঘকালের। সাধারণভাবে কখনো কম কখনো বেশি ঘাটতি নিয়েই দেশ চলেছে। এবারের মতো সংকটময় পরিস্থিতির উদ্ভব কালেভদ্রেই হয়ে থাকে। সেই পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, জ্বালানিনিরাপত্তার দিক দিয়ে আমাদের অবস্থান কতটা নাজুক ও ভঙ্গুর।


বর্তমানে আমাদের দেশের প্রধান তিনটি বাণিজ্যিক জ্বালানি পণ্যের অন্যতম হচ্ছে এলপি গ্যাস। অন্য দুটি হলো জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। এর মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাসের একাংশই কেবল দেশের নিজস্ব ক্ষেত্র থেকে পাওয়া যায়। অবশ্য তার পরিমাণও প্রায় দশককাল ধরে অব্যাহতভাবে কমে আসছে। ২০১৮ সাল থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসও আমদানি করা হচ্ছে তরলীকৃত (এলএনজি) আকারে।

এ ছাড়া দেশের সবেধন নীলমণি পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বছরে ১২ থেকে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে এলপি গ্যাসের যেটুকু কাঁচামাল (প্রোপেন ও বিউটেন) পাওয়া যায়, তা দিয়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এলপিজি প্ল্যান্টে সামান্য পরিমাণে এলপি গ্যাস তৈরি হয়, যা বর্তমান চাহিদার ১ শতাংশের বেশি নয়। আর ৯৯ শতাংশ প্রোপেন-বিউটেনই আমদানি করা হয়। এগুলো আমদানি ও বোতলজাতসহ বাজারজাত করে ২৯টি বেসরকারি কোম্পানি। আর জ্বালানি তেল চাহিদার শতভাগই আমদানি করা হয়। এই কথাগুলো বলছি এটা বোঝানোর জন্য যে আমাদের মতো বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতিতে থাকা একটি দেশের জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভরতা আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার সবচেয়ে বড় কারণ। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে আমাদের দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার আহরণ বাড়ানোর কাজটি একপ্রকার উপেক্ষিতই রয়ে গেছে।

এবার বর্তমান এলপি গ্যাসের সংকট প্রসঙ্গে আসি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগ গত বুধ-বৃহস্পতিবার কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে, যা অনেক বিলম্বিত। তবে এগুলো বাস্তবায়িত হলে সংকট সমাধানে কিছুটা সুফল পাওয়া যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে এলপি গ্যাসের আমদানি বাড়াতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। শুল্ক কমাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং এলসি (ঋণপত্র) খোলা সহজ করতে বাংলাদেশ ব‍্যাংককে অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া। এলপি গ্যাস আমদানি ও বাজারজাতকারী বড় পাঁচটি কোম্পানিকে বাড়তি আমদানির অনুমতি দিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) চিঠি দেওয়া। এ ছাড়া বিইআরসি উদ্যোগ নিয়েছে এলপি গ্যাস বিতরণকারী ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ গ্রহণের। যদিও এ জন্য বিইআরসিকে কোনো আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী কোম্পানির কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেতে হবে। সেই প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করতে হবে। তারপরই কমিশন বাড়ানো সম্ভব হবে। তবে বিইআরসির উদ্যোগে সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে আশা করা যায়।


মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগ এবং বিইআরসি এই যে পদক্ষেপ এবং উদ্যোগগুলো নিয়েছে, এগুলোর মধ্যেই এলপি গ্যাসের বর্তমান সংকটজনক পরিস্থিতি সৃষ্টির কারণ লুকিয়ে আছে। যেমন উদ্যোগগুলোর মধ্যে প্রথমেই আছে দ্রুত আমদানি বাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া। তার মানে হলো আমদানি কম করা হয়েছিল। এর কারণ, মৌসুমি কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি যেমন হতে পারে, তেমনি আমদানিকারকদের চাহিদা অনুযায়ী এবং প্রয়োজনমতো এলসি খোলায় সমস্যা হতে পারে। আরও হতে পারে আমদানি করার জন্য জাহাজের সংকট। কেননা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউরোপ শীতকালে সুস্থমতো বাঁচতে পারে শুধু এলএনজি আর এলপি গ্যাসের কল্যাণে। তা ছাড়া বিশ্ব মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেকগুলো জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। জ্বালানির মতো একটি কৌশলগত জ্বালানিপণ্য যাদের আমদানি করে চলতে হয়, তাদের এসব বিষয় আগেভাগেই ভাবতে হয়। না হলে যে বিপদে পড়তে হয়, তার প্রমাণ এই সংকটে আরও একবার পাওয়া গেল।


মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় উদ্যোগ ট্যাক্স-ভ্যাট কমানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দেওয়া। জ্বালানি খাত হলো সরকারের ট্যাক্স-ভ্যাট আহরণের এক সোনার খনি। সরকারি টাকায় যে তেল-গ্যাস কিনে আনা হয় তার ওপরই সরকার আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর, অগ্রিম আয়কর প্রভৃতি নামে ঘাটে ঘাটে ট্যাক্স-ভ্যাট আরোপ করে উচ্চ হারে রাজস্ব আহরণ করে। তাতে রাজস্ব বিভাগের ভালো পারফরম্যান্স দেখানো গেলেও তলায় তেমন কিছুই পড়ে না। শুধু হিসাবের খাতা মোটা হয়। আর হয় জনগণের ভোগান্তি। কারণ, সরকারের আরোপ করা সব ট্যাক্স-ভ্যাট জোগান দিতে হয় তাদেরই। তারপরও যদি চাহিদামতো জ্বালানির সরবরাহ পাওয়া যেত! কিন্তু সেটা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধিজনিত সংকটের সময় অনেক দেশই ট্যাক্স-ভ্যাট-শুল্ক কমিয়ে জনগণকে যতটুকু সম্ভব সাশ্রয়ী দামে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেয়। যারা দক্ষতার সঙ্গে এগুলো করে তারা বিষয়গুলো আগেভাগেই ভেবে রাখে। জনগণকে সংকটের মধ্যে ফেলার পর ভাবনাচিন্তা শুরু করা আমাদের জ্বালানি খাতের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অদক্ষতারই প্রমাণ।


মন্ত্রণালয়ের তৃতীয় পদক্ষেপের ফলে হয়তো বড় পাঁচটি কোম্পানি আমদানি বাড়াবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে এখন দাম বেশি। তার ওপর পরিবেশক বা বিতরণকারী এবং খুচরা ব্যবসায়ী পর্যায়ে কমিশনও বাড়াতে হবে। এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই এই জায়গায় একটি ফাঁক (গ্যাপ) রয়ে গেছে। এখন কমিশন বাড়ালে খরচ বাড়বে, যা সিলিন্ডারের দামের সঙ্গেই যুক্ত হবে। সুতরাং ভোক্তাপর্যায়ে এলপি গ্যাস কতটুকু কম দামে দেওয়া সম্ভব হবে, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও