
নেতার কার্বন কপি হয় না
পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো নেতা একেবারে হুবহু আরেকজনের মতো হন না। প্রতিটি নেতা তাঁদের সময়, সমাজ, রাজনীতি ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তৈরি হন। তাঁদের দর্শন, আদর্শ ও নেতৃত্বের ধরন স্বতন্ত্র হয়। লেনিন, মাও সে-তুং, হো চি মিন, ফিদেল কাস্ত্রো, জর্জ ওয়াশিংটন, গান্ধী, নেহরু, শেখ মুজিবুর রহমান—এই নেতারা সবাই বিশ্বরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের পথচলা ছিল ভিন্ন, তাঁদের চ্যালেঞ্জ ছিল স্বতন্ত্র এবং তাঁদের কৌশলও ছিল ভিন্ন ভিন্ন।
একজন নেতা শুধু নিজের ব্যক্তিগত গুণাবলির জন্য নেতা হয়ে ওঠেন না; বরং তাঁর সময়ের প্রয়োজনে, জনগণের আকাঙ্ক্ষা, সমাজের অবস্থা এবং ইতিহাসের গতি তাঁকে নেতা হিসেবে গড়ে তোলে। লেনিন যখন রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন, তখন সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির এক প্রবল সংগ্রাম চলছিল। তিনি মার্ক্সবাদকে প্রয়োগের নতুন রূপ দিলেন, যা রাশিয়ার মতো একটি বিশাল দেশের জন্য উপযুক্ত ছিল। অন্যদিকে, মাও সে-তুং চীনে মার্ক্সবাদকে কৃষকশ্রেণির ভিত্তিতে নতুন আঙ্গিকে প্রাণ দিলেন। হো চি মিন ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে একটি স্বাধীন ভিয়েতনামের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করলেন।
ফিদেল কাস্ত্রো লাতিন আমেরিকার এক কিংবদন্তি নেতা। কিউবায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনা করেন এবং আমেরিকার আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। তিনি তাঁর দেশের জন্য এক ভিন্ন মডেল তৈরি করেন, যা সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের চেয়ে আলাদা ছিল। আবার জর্জ ওয়াশিংটন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা হয়ে একটি নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর নেতৃত্ব মার্কিন সংবিধানের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।
গান্ধী ও নেহরু ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান দুই ব্যক্তিত্ব। গান্ধীর অহিংস আন্দোলন এবং নেহরুর আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের নীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ধারা হলেও তাঁরা একে অপরের পরিপূরক ছিলেন। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা। তাঁর নেতৃত্বের ধরনও ছিল স্বতন্ত্র—তিনি ছিলেন একদিকে আবেগপ্রবণ, অন্যদিকে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের মিশেলে এক নতুন ধারার জননায়ক।
নেতৃত্বের এই ভিন্নতা আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা দেখি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নেতাদের ভূমিকা কীভাবে বদলায়? নেলসন ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, দীর্ঘ ২৭ বছর কারাবরণ করেছেন এবং অবশেষে শান্তিপূর্ণভাবে একটি গণতান্ত্রিক দক্ষিণ আফ্রিকা প্রতিষ্ঠা করেছেন। আবার উইনস্টন চার্চিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটেনের প্রধান নেতা হিসেবে সাহসী নেতৃত্ব দিয়েছেন, অথচ শান্তিকালে তাঁর জনপ্রিয়তা কমে যায়।
প্রতিটি নেতা তাঁদের সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্ভাবনী কৌশল গ্রহণ করেন। আব্রাহাম লিঙ্কন যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা বিলোপের জন্য সংগ্রাম করেছেন, যা সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আরব বিশ্বে গামাল আবদেল নাসের প্যান-আরব জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করে মধ্যপ্রাচ্যে রাজনীতি বদলে দেন।
একজন নেতা কখনোই আরেকজনের প্রতিরূপ হন না। কারণ, তাঁদের সময়, সংকট, আদর্শ ও ব্যক্তিগত গুণাবলি ভিন্ন। প্রত্যেক নেতা তাঁদের নিজস্ব পথ তৈরি করেন, যা একেবারে অনন্য। এই কারণেই ইতিহাসে আমরা দেখি, যুগে যুগে নতুন নেতা জন্ম নিলেও তাঁরা কখনো আগের কোনো নেতার সঠিক প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠেন না। তাঁরা তাঁদের সময়ের প্রয়োজন মেটাতে নতুন আদর্শ ও কৌশল তৈরি করেন, যা তাঁদের ইতিহাসে অনন্য করে রাখে।